| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | মিয়াঁ মুহাম্মদ নওয়াজ শরিফ |
| জন্ম | ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৯ |
| জন্মস্থান | লাহোর, পাঞ্জাব, পাকিস্তান |
| পেশা | রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী |
| জাতীয়তা | পাকিস্তানি |
| রাজনৈতিক দল | পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) |
| পরিচিতি | পাকিস্তানের তিনবারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী |
| স্ত্রী | কুলসুম নওয়াজ (প্রয়াত) |
| সন্তান | মরিয়ম নওয়াজ, হাসান নওয়াজ, হুসেইন নওয়াজ, আসমা নওয়াজ |
পরিচিতি
মিয়াঁ মুহাম্মদ নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। তার রাজনৈতিক জীবন উত্থান-পতনে ভরা; প্রতিটি মেয়াদই শেষ হয়েছে ক্ষমতাচ্যুতি বা বিতর্কের মধ্য দিয়ে। একজন সফল ব্যবসায়ী থেকে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে আরোহণ করা নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
নওয়াজ শরিফ ১৯৪৯ সালের ২৫শে ডিসেম্বর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে এক কাশ্মীরি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মুহাম্মদ শরিফ ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, যিনি ইত্তেফাক গ্রুপ নামে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। নওয়াজ শরিফের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে লাহোরের একটি সমৃদ্ধ পরিবেশে। তার পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে মুসলিম লীগ সমর্থক ছিল এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল, যা তার ভবিষ্যতের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। পারিবারিক ব্যবসার সুবাদে তিনি ছোটবেলা থেকেই অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তব ধারণা লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন
নওয়াজ শরিফ তার প্রাথমিক শিক্ষা লাহোরের সেন্ট অ্যান্টনি'স হাই স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি লাহোরের সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় (Government College University) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ল কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি লাভ করেন। তার শিক্ষাজীবন তাকে বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা এবং দেশের আইন ও শাসন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে, যা তার রাজনৈতিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়।
ক্যারিয়ার
নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে পাঞ্জাব প্রাদেশিক রাজনীতিতে। জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে তিনি পাঞ্জাবের প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। তার অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা দ্রুত তাকে পরিচিতি এনে দেয়।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী
১৯৮৫ সালে তিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগ দেন, যা তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
প্রথম প্রধানমন্ত্রীত্ব (১৯৯০-১৯৯৩)
১৯৯০ সালে নওয়াজ শরিফ প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার প্রথম মেয়াদে তিনি অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বেসরকারীকরণ নীতি গ্রহণ করেন। তবে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোলাম ইসহাক খানের সাথে সাংবিধানিক দ্বন্দ্বের জেরে ১৯৯৩ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীত্ব (১৯৯৭-১৯৯৯)
১৯৯৭ সালের নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ভূমিধস বিজয় লাভ করে এবং তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে তিনি সংবিধানের ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ সংশোধনী আনেন, যা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা হ্রাস করে এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার জবাবে পাকিস্তান সফলভাবে পারমাণবিক পরীক্ষা (চাগাই-১) চালায়, যা তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা এনে দেয়। তবে, ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সাথে মতবিরোধের জেরে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং নির্বাসনে পাঠানো হয়।
নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন
নির্বাসনে থাকাকালীন তিনি সৌদি আরব ও লন্ডনে কাটান। ২০০৭ সালে তিনি পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন এবং তার রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেন।
তৃতীয় প্রধানমন্ত্রীত্ব (২০১৩-২০১৭)
২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের দল আবারও বিজয়ী হয় এবং তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এই মেয়াদে তার সরকার দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগত উদ্যোগে মনোযোগ দেয়। তার শাসনামলে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়।
ক্ষমতাচ্যুতি ও আইনি জটিলতা
২০১৬ সালে পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে তার পরিবারের সদস্যদের নাম জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ২৮শে জুলাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে এবং তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর তাকে বিভিন্ন দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং এখনো সেখানে অবস্থান করছেন।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- অর্থনৈতিক সংস্কার: নওয়াজ শরিফ তার প্রথম দুই মেয়াদে অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং বেসরকারীকরণ নীতি গ্রহণ করেন, যা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে।
- পারমাণবিক শক্তি অর্জন: ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার জবাবে পাকিস্তানের চাগাই-১ পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, যা পাকিস্তানকে একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
- অবকাঠামো উন্নয়ন: তার শাসনামলে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোটরওয়ে নির্মাণ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের সূচনা হয়, যা পাকিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- সন্ত্রাসবাদ দমন: তৃতীয় মেয়াদে তিনি সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে সাহায্য করে।
- গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা: সামরিক শাসনের পর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ব্যক্তিগত জীবন
নওয়াজ শরিফ ১৯৭০ সালে কুলসুম নওয়াজকে বিবাহ করেন। কুলসুম নওয়াজ একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছেন। তাদের চার সন্তান—মরিয়ম নওয়াজ, হাসান নওয়াজ, হুসেইন নওয়াজ এবং আসমা নওয়াজ। তার স্ত্রী কুলসুম নওয়াজ ২০১৮ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নওয়াজ শরিফ তার পরিবারের প্রতি অত্যন্ত অনুগত এবং পারিবারিক বন্ধনকে তিনি সবসময়ই মূল্য দিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত জীবনও তার রাজনৈতিক জীবনের মতোই নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে নির্বাসন ও আইনি লড়াই।
মজার তথ্য
- নওয়াজ শরিফ একজন ক্রিকেট অনুরাগী। তিনি তরুণ বয়সে ক্রিকেট খেলতেন এবং পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডের একজন কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।
- তার পরিবার পাকিস্তানের অন্যতম ধনী শিল্পপতি পরিবার। তাদের ইত্তেফাক গ্রুপ ইস্পাত, চিনি এবং টেক্সটাইল সহ বিভিন্ন শিল্পে জড়িত।
- তিনিই একমাত্র পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ যিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, এবং প্রতিটি মেয়াদেই তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
- তিনি পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন।
উপসংহার
নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক জীবন পাকিস্তানের ইতিহাসের এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিচ্ছবি। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তার শাসনামলে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তার অবস্থান সুসংহত হয়। তবে, তার ক্যারিয়ার বিতর্ক, ক্ষমতাচ্যুতি এবং আইনি জটিলতায় পূর্ণ। তা সত্ত্বেও, নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছেন এবং তার উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: নওয়াজ শরিফ কে?
উত্তর: নওয়াজ শরিফ হলেন একজন পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী, যিনি তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) দলের প্রধান।
প্রশ্ন: তিনি কতবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন?
উত্তর: নওয়াজ শরিফ মোট তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তার মেয়াদগুলো ছিল ১৯৯০-১৯৯৩, ১৯৯৭-১৯৯৯ এবং ২০১৩-২০১৭ সাল পর্যন্ত।
প্রশ্ন: তার উল্লেখযোগ্য অর্জন কী কী?
উত্তর: তার উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা (চাগাই-১), মোটরওয়ে নির্মাণ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের সূচনা।
প্রশ্ন: কেন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল?
উত্তর: তাকে বিভিন্ন কারণে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। প্রথমবার সাংবিধানিক দ্বন্দ্বের কারণে, দ্বিতীয়বার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং তৃতীয়বার পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির জেরে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অযোগ্য ঘোষণার মাধ্যমে।
প্রশ্ন: নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক দল কোনটি?
উত্তর: নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক দলের নাম হলো পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) বা PML-N।
প্রশ্ন: পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির সাথে তার সম্পর্ক কী ছিল?
উত্তর: পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ শরিফের পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অফশোর কোম্পানি থাকার অভিযোগ ওঠে। এর জেরে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে।
প্রশ্ন: বর্তমানে নওয়াজ শরিফ কোথায় আছেন?
উত্তর: নওয়াজ শরিফ বর্তমানে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন। তিনি বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারেননি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন