ইলন মাস্ক বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং মানব ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী এই আমেরিকান ব্যবসায়ী মূলত টেসলা (Tesla) এবং স্পেসএক্স (SpaceX)-এর মতো যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশ গবেষণায় অভাবনীয় বিপ্লব ঘটিয়েছেন। যারা আধুনিক প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ এবং একজন মানুষের অসীম স্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাদের জন্য ইলন মাস্ক এর জীবনী এক অবিস্মরণীয় পাঠ্য এবং অনুপ্রেরণার উৎস। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ বিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদান মানবজাতিকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে, এবং তিনি প্রমাণ করেছেন যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো স্বপ্নই অধরা থাকে না।
By Gage Skidmore - https://www.flickr.com/photos/gageskidmore/54820081119/, CC BY-SA 4.0, Link
এক নজরে (Quick Facts)
সম্পূর্ণ নাম: ইলন রিভ মাস্ক
জন্ম তারিখ: ২৮ জুন, ১৯৭১
জন্মস্থান: প্রিটোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা
মৃত্যু তারিখ: প্রযোজ্য নয়
জাতীয়তা: দক্ষিণ আফ্রিকান, কানাডিয়ান এবং আমেরিকান
পেশা: উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক, বিনিয়োগকারী এবং সিইও
উল্লেখযোগ্য কাজ: স্পেসএক্স (SpaceX), টেসলা (Tesla), এক্স (সাবেক টুইটার), পেপ্যাল (PayPal), নিউরালিংক এবং এক্সএআই (xAI) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
ইলন মাস্ক ১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় এক সচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা এরল মাস্ক ছিলেন একজন দক্ষিণ আফ্রিকান ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল প্রকৌশলী, পাইলট, নাবিক এবং ব্যবসায়ী। অন্যদিকে তাঁর মা মে মাস্ক ছিলেন একজন কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত সফল মডেল এবং ডায়েটিশিয়ান। তিন ভাইবোনের মধ্যে ইলন সবার বড়, তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম কিম্বল এবং ছোট বোনের নাম তোসকা। মাস্কের শৈশব খুব একটা সুখকর বা শান্তিময় ছিল না। মাত্র নয় বছর বয়সে তাঁর বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাঁর বাবার সাথে থাকার, কিন্তু পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে অনেক মানসিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি প্রায়ই অন্যান্য ছাত্রদের দ্বারা বুলিং বা চরম নির্যাতনের শিকার হতেন। একবার একদল সহপাঠী তাঁকে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে অমানবিক মারধর করে, যার ফলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং বেশ কয়েক দিন তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়।
শারীরিক ও মানসিক এই ভয়াবহ প্রতিকূলতার মাঝেই মাস্ক বইয়ের জগতে নিজের নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পড়ার প্রচণ্ড নেশা ছিল। তিনি দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টার বেশি সময় বই পড়ে কাটাতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি আইজ্যাক অ্যাসিমভের সায়েন্স ফিকশন এবং ডগলাস অ্যাডামসের 'দ্য হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি'-এর মতো বইগুলো পড়ে মহাকাশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। একই সময়ে তিনি একটি কমোডোর ভিআইসি-২০ (Commodore VIC-20) কম্পিউটার হাতে পান। যেখানে সাধারণ মানুষের এই কম্পিউটারের ম্যানুয়াল বুঝতে ৬ মাস সময় লাগতো, সেখানে তিনি মাত্র তিন দিনেই সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল আয়ত্ত করে নিজে নিজেই প্রোগ্রামিং শেখেন। তাঁর মেধা ও সৃজনশীলতার প্রথম ঝলক দেখা যায় যখন মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি 'ব্লাস্টার' (Blastar) নামে একটি স্পেস-শুটার ভিডিও গেম তৈরি করেন। পরবর্তীতে তিনি একটি পিসি ম্যাগাজিনের কাছে ৫০০ ডলারে গেমটির সোর্স কোড বিক্রি করে তাঁর জীবনের প্রথম উপার্জন করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশ নিতে তাঁর চরম অনীহা ছিল, কারণ তিনি বর্ণবাদী সরকারের অধীনে কাজ করতে চাননি। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এবং সিলিকন ভ্যালিতে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে মাস্ক ১৭ বছর বয়সে তাঁর মায়ের আত্মীয়দের কাছে কানাডায় পাড়ি জমান। কানাডায় প্রথম দিকের জীবন তাঁর জন্য অত্যন্ত সংগ্রামমুখর ছিল। সেখানে শুরুতে তিনি আত্মীয়দের খামারে কাজ করা, সবজি চাষ, এবং একটি কাঠের মিলে বয়লার পরিষ্কার করার মতো অত্যন্ত কঠিন কায়িক শ্রম দিয়েছেন। ১৯৮৯ সালে তিনি কানাডার অন্টারিওতে অবস্থিত কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে (Queen's University) ভর্তি হন। সেখানে দুই বছর কঠোর অধ্যবসায়ের পর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লিগভুক্ত স্বনামধন্য পেন্সিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Pennsylvania) স্থানান্তরিত হন। সেখান থেকে তিনি পদার্থবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি—এই দুটি ভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ চালানোর জন্য তিনি এবং তাঁর এক বন্ধু মিলে একটি ১০ বেডরুমের বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেটিকে নাইট ক্লাবে পরিণত করতেন। পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান তাঁকে মহাকাশ বিজ্ঞানের শক্ত ভিত্তি দিয়েছিল এবং অর্থনীতির জ্ঞান তাঁকে ব্যবসার নিখুঁত কৌশল শিখিয়েছিল। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও বস্তুবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু তখন ইন্টারনেট বিপ্লব বা 'ডট-কম বুম' শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেটের অপার সম্ভাবনা বুঝতে পেরে মাত্র দুই দিনের মাথায় তিনি স্ট্যানফোর্ড ছেড়ে দেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের ভাগ্য পরীক্ষার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন।
কর্মজীবন ও প্রধান অর্জন
ইলন মাস্কের কর্মজীবন এক দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর এবং রোমাঞ্চকর উত্থান-পতনের গল্প। সিলিকন ভ্যালিতে তাঁর শূন্য হাতে যাত্রা থেকে শুরু করে মহাকাশ জয়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।
কর্মজীবনের শুরু এবং পেপ্যাল প্রতিষ্ঠা
স্ট্যানফোর্ড ছাড়ার পর ১৯৯৫ সালে ইলন মাস্ক তাঁর ছোট ভাই কিম্বল মাস্ককে সাথে নিয়ে 'জিপটু' (Zip2) নামক একটি ওয়েব সফটওয়্যার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মূলত সংবাদপত্র প্রকাশকদের জন্য একটি অনলাইন সিটি গাইড, যা মানচিত্রের সাথে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা যুক্ত করে দিকনির্দেশনা দিত। শুরুতে তাঁদের কোনো বাড়ি বা অফিস ছিল না; তাঁরা একটি ছোট গুদামঘর ভাড়া নিয়ে সেখানেই কাজ করতেন এবং রাতে ফ্লোরে ঘুমাতেন। গোসলের জন্য তাঁদের ওয়াইএমসিএ (YMCA)-এর পাবলিক বাথরুমে যেতে হতো। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তাঁদের কোম্পানিটি সফলতা লাভ করে। ১৯৯৯ সালে বিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কমপ্যাক (Compaq) ৩০৭ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে জিপটু কিনে নেয়। এই চুক্তি থেকে মাস্ক তাঁর শেয়ারের অংশ হিসেবে ২২ মিলিয়ন ডলার লাভ করেন।
জিপটু বিক্রির পর মাস্ক বুঝতে পারেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি তাঁর অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করে 'এক্স ডট কম' (X.com) প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০০ সালে কোম্পানিটি তাদের মূল প্রতিযোগী 'কনফিনিটি' (Confinity)-এর সাথে একীভূত হয়, যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পিটার থিয়েল। এই একীভূত কোম্পানির নতুন নাম দেওয়া হয় 'পেপ্যাল' (PayPal)। ইলন মাস্ক যখন তাঁর প্রথম স্ত্রীর সাথে অস্ট্রেলিয়ায় মধুচন্দ্রিমায় ছিলেন, তখন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ এক ক্যু-এর মাধ্যমে তাঁকে সিইও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পেপ্যাল খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০২ সালে ই-কমার্স জায়ান্ট ইবে (eBay) ১.৫ বিলিয়ন ডলারে পেপ্যাল অধিগ্রহণ করে। পেপ্যালের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে মাস্ক প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার পান। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তাঁর পরবর্তী স্বপ্নের প্রকল্পগুলোর মূলধন হিসেবে কাজ করে।
স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠা ও মহাকাশ জয়ের সংগ্রাম
পেপ্যাল বিক্রির অর্থ নিয়ে মাস্ক চাইলে বাকি জীবন আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল মানবজাতিকে অন্য গ্রহে নিয়ে যাওয়া। তিনি প্রথমে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন পুরোনো আইসিবিএম (ICBM) রকেট কেনার জন্য, যাতে তিনি মঙ্গলে একটি ছোট গ্রিনহাউস পাঠাতে পারেন। কিন্তু রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা তাঁকে অপমান করেন এবং তাঁর ধারণাকে তাচ্ছিল্য করেন। এই অপমান তাঁকে নিজের রকেট তৈরির জেদ এনে দেয়। ২০০২ সালে তিনি ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে মহাকাশ যান প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'স্পেসএক্স' (SpaceX) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশ ভ্রমণের ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে আনা এবং রকেট পুনরায় ব্যবহারযোগ্য (Reusable) করা।
শুরুতে স্পেসএক্সের যাত্রা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রথম তিনটি ফ্যালকন-১ (Falcon 1) রকেট উৎক্ষেপণ পরপর ব্যর্থ হয় এবং ধ্বংস হয়ে যায়। ২০০৮ সালের দিকে কোম্পানির তহবিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। মাস্ক তখন চরম অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলেন। চতুর্থ উৎক্ষেপণটি ব্যর্থ হলে স্পেসএক্স চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ সম্বল দিয়ে করা চতুর্থ উৎক্ষেপণটি সফল হয়। এর ফলশ্রুতিতে নাসা (NASA) স্পেসএক্সকে মহাকাশ স্টেশনে রসদ পৌঁছানোর জন্য ১.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি প্রদান করে। এই চুক্তি স্পেসএক্সকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে। এরপর স্পেসএক্সকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ফ্যালকন ৯ এবং বর্তমানে সর্ববৃহৎ রকেট 'স্টারশিপ' (Starship)-এর মাধ্যমে স্পেসএক্স মহাকাশ গবেষণায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে।
টেসলা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব
মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি মাস্ক পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেন। ২০০৪ সালে তিনি 'টেসলা মোটরস' (বর্তমান টেসলা ইনকর্পোরেটেড)-এ প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি মূলত মার্টিন এবারহার্ড এবং মার্ক টারপেনিং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু মাস্কের অর্থায়নেই এটি প্রাণ পায়। ২০০৮ সালে তীব্র আর্থিক সংকটের সময় তিনি টেসলার প্রধান নির্বাহী (CEO) হন।
টেসলাও ২০০৮ সালে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছিল। মাস্ক তাঁর ব্যক্তিগত সমস্ত অর্থ কোম্পানিতে ঢেলে দেন, এমনকি নিজের দৈনন্দিন খরচ চালানোর মতো অর্থও তাঁর কাছে ছিল না। বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে তাঁকে চলতে হয়েছে। অদম্য জেদ এবং পরিশ্রমের ফলে টেসলা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তাদের প্রথম গাড়ি 'রোডস্টার' এরপর 'মডেল এস', 'মডেল ৩', এবং পরবর্তীতে 'সাইবারট্রাক'-এর মতো আধুনিক গাড়িগুলো বাজারে এনে টেসলা অটোমোবাইল শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বর্তমানে টেসলা শুধু একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং (Autopilot) সফটওয়্যার তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান।
টুইটার অধিগ্রহণ ও অন্যান্য যুগান্তকারী উদ্যোগ
ইলন মাস্কের উদ্ভাবনী চিন্তার কোনো সীমানা নেই। যানজট নিরসনে ভূগর্ভস্থ টানেল তৈরির জন্য তিনি 'দ্য বোরিং কোম্পানি' (The Boring Company) প্রতিষ্ঠা করেন। মানুষের মস্তিষ্কের সাথে কম্পিউটারের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে তিনি 'নিউরালিংক' (Neuralink) নামে একটি নিউরোটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা ইতিমধ্যে মানব মস্তিষ্কে সফলভাবে চিপ স্থাপন করেছে। পৃথিবীর দুর্গম অঞ্চলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্পেসএক্সের অধীনে 'স্টারলিংক' (Starlink) প্রজেক্ট শুরু করেন, যা বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক দুর্যোগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০২২ সালের শেষের দিকে মাস্ক দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল চুক্তির বিনিময়ে জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম টুইটার (Twitter) কিনে নেন। তিনি প্ল্যাটফর্মটিতে পূর্ণাঙ্গ বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে 'এক্স' (X) রাখেন। টুইটার অধিগ্রহণের পর তিনি কোম্পানির ব্যয় সংকোচনের জন্য কর্মী সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনেন এবং প্ল্যাটফর্মটিকে একটি 'এভরিথিং অ্যাপ' (Everything App) বা সর্বাত্মক অ্যাপে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন।
সাফল্য ও স্বীকৃতি
২০২০ সালের পর থেকে ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। টেসলার শেয়ারের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি তাঁকে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় নিয়ে আসে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআই (xAI)-কে স্পেসএক্সের সাথে একীভূত করার পর স্পেসএক্সের মোট ভ্যালুয়েশন ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এর ফলে ২০২৬ সালে ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়, যা তাঁকে শুধু বর্তমান সময়ের নয়, মানব ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। এছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিচালনায় দক্ষতা বাড়াতে গঠিত 'ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি' (DOGE) বা ডোজ-এর প্রধান হিসেবেও তিনি ব্যাপক সংস্কারমূলক কাজ করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন
ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত জীবন তাঁর কর্মজীবনের মতোই ঘটনাবহুল, রোমাঞ্চকর এবং আলোচিত। তিনি ২০০০ সালে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমিকা এবং কানাডিয়ান লেখিকা জাস্টিন উইলসনকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে ছয়জন সন্তানের জন্ম হয়, যার মধ্যে প্রথম সন্তানটি (নেভাডা) মাত্র ১০ সপ্তাহ বয়সে সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোমে মারা যায়। এরপর আইভিএফ (IVF) পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁদের যমজ এবং পরবর্তীতে একসঙ্গে তিন সন্তানের জন্ম হয়। ২০০৮ সালে জাস্টিন ও মাস্কের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তিনি ব্রিটিশ অভিনেত্রী তালুলাহ রাইলিকে বিয়ে করেন। রাইলির সাথে তাঁর সম্পর্কটি ছিল বেশ নাটকীয়; তাঁরা দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দুবারই তাঁদের আইনি বিচ্ছেদ ঘটে।
পরবর্তীতে তিনি জনপ্রিয় কানাডিয়ান সঙ্গীতশিল্পী গ্রাইমসের (Grimes) সাথে সম্পর্কে জড়ান এবং তাঁদের কয়েকটি সন্তান হয়, যাদের মধ্যে প্রথম সন্তানের 'X Æ A-12' (উচ্চারণ: এক্স অ্যাশ এ টুয়েলভ) নামটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এছাড়া তাঁর নিউরালিংকের শীর্ষ কর্মকর্তা শিভন জিলিসের সাথেও তাঁর যমজ সন্তান রয়েছে। মাস্ক বিশ্বের জনসংখ্যা কমে যাওয়া (Population collapse) নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং তিনি বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে আরও বেশি সন্তান জন্ম নেওয়া উচিত।
মাস্ক একজন চরম পরিশ্রমী বা 'ওয়ার্কাহোলিক' মানুষ। তিনি সপ্তাহে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। টেসলার 'মডেল ৩' উৎপাদনের চরম সংকটের সময় তিনি নিজের বাড়িতে না গিয়ে মাসের পর মাস কারখানার মেঝেই ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। ২০২১ সালে জনপ্রিয় টিভি শো 'স্যাটারডে নাইট লাইভ'-এ উপস্থাপনা করার সময় তিনি প্রকাশ্যে জানান যে, তিনি 'অ্যাসপারগারস সিনড্রোম' (Asperger's syndrome) নামক এক ধরণের অটিজমে আক্রান্ত। এই মানসিক অবস্থা তাঁর সামাজিক আচরণে বা কথা বলার ধরনে কিছুটা ভিন্নতা আনলেও, এটি তাঁর অসাধারণ ফোকাস, নির্ভুল গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
অবদান ও স্বীকৃতি
মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ইলন মাস্কের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা তাঁকে এই প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তিনি বিশ্বকে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, বৈদ্যুতিক গাড়ি শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং এগুলো সাধারণ পেট্রোলিয়াম চালিত গাড়ির চেয়ে বেশি দ্রুতগতির, নিরাপদ এবং বিলাসবহুল হতে পারে। তাঁর এই অসামান্য উদ্যোগের ফলে বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে বাধ্য হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এক বিশাল অবদান।
মহাকাশ শিল্পে তাঁর অবদান আরও বেশি যুগান্তকারী এবং কল্পনাতীত। স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ এবং স্টারশিপ রকেটের মাধ্যমে তিনি রকেট রিইউজেবিলিটি বা পুনঃব্যবহারযোগ্যতার ধারণা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। একসময় রকেট একবার ব্যবহারের পর ধ্বংস হয়ে যেত, কিন্তু তিনি রকেটকে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে পুনরায় ব্যবহারের যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, তা মহাকাশ ভ্রমণের খরচ নব্বই শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে এনেছে। তাঁর জীবনের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে এক মিলিয়ন মানুষের একটি স্বনির্ভর উপনিবেশ স্থাপন করা, যাতে পৃথিবী কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে গেলেও মানবজাতি টিকে থাকতে পারে। মানবজাতিকে একটি 'মাল্টি-প্ল্যানেটারি' বা বহুগামী গ্রহে বসবাসকারী প্রজাতিতে পরিণত করার এই নিরলস প্রচেষ্টা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য
১. ইলন মাস্কের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ কত?
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্স এবং টেসলার শেয়ারের বিশাল মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইলন মাস্কের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অকল্পনীয় সম্পদের সুবাদে তিনি বর্তমানে মানব ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত।
২. ইলন মাস্ক কয়টি কোম্পানির মালিক বা প্রতিষ্ঠাতা?
ইলন মাস্ক বর্তমানে স্পেসএক্স, টেসলা, এক্স (সাবেক টুইটার), নিউরালিংক এবং দ্য বোরিং কোম্পানিসহ বেশ কয়েকটি বড় ও যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও নিয়ন্ত্রক। এছাড়া তাঁর উদ্ভাবিত এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআই (xAI) স্পেসএক্সের সাথে যুক্ত হয়ে একটি বিশাল প্রযুক্তি সাম্রাজ্য তৈরি করেছে।
৩. ইলন মাস্কের শিক্ষাগত যোগ্যতা কী?
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত আইভি লিগ প্রতিষ্ঠান পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি—এই দুটি ভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এরপর তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হলেও ইন্টারনেট বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখে উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্যে মাত্র দুই দিন পর তা ছেড়ে দেন।
No comments:
Post a Comment