| তথ্যসারণি | |
|---|---|
| নাম | যশ (মঞ্চনাম) |
| পুরো নাম | নবীন কুমার গৌড়া |
| জন্ম | ৮ জানুয়ারি ১৯৮৬ |
| জন্মস্থান | বুভানাহাল্লি, হাসান, কর্ণাটক, ভারত |
| পেশা | অভিনেতা |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| স্ত্রী | রাধিকা পণ্ডিত |
| সন্তান | আইরা, ইয়াথারভ |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ১, কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ২, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামচারি, গোগলি |
পরিচিতি
যশ, যিনি নবীন কুমার গৌড়া নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশেষত কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পে তার অবদান অপরিসীম। 'রকিং স্টার যশ' নামেই তিনি তার ভক্তদের কাছে পরিচিত। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে 'কে.জি.এফ' (K.G.F) ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে, যা তাকে শুধুমাত্র কর্ণাটকেই নয়, বরং সমগ্র ভারতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একজন প্যান-ইন্ডিয়া সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার শক্তিশালী অভিনয়, ক্যারিশম্যাটিক উপস্থিতি এবং বক্স অফিসে অসাধারণ সাফল্যের কারণে যশ বর্তমানে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
১৯৮৬ সালের ৮ জানুয়ারি কর্ণাটকের হাসান জেলার বুভানাহাল্লি গ্রামে যশ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা অরুণ কুমার পেশায় একজন বিএমটিসি (বেঙ্গালুরু মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন) বাসের চালক ছিলেন এবং মা পুষ্পা একজন গৃহিণী। যশের একটি ছোট বোন আছে যার নাম নন্দিনী। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা যশ ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তার বাবা-মা চেয়েছিলেন তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিন, কিন্তু যশের মন ছিল সিনেমার দিকে। তিনি প্রায়শই তার বন্ধুদের সঙ্গে স্থানীয় থিয়েটার গ্রুপে যোগ দিতেন এবং বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করতেন।
শিক্ষাজীবন
যশ তার প্রাথমিক শিক্ষা মহীশূরে সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। তার অভিনয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে 'বেনাকা' নাট্যদলের সাথে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে, যা প্রয়াত বি.ভি. কারান্থ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই নাট্যদলে কাজ করার সময় তিনি অভিনয়ের মৌলিক বিষয়গুলি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন এবং মঞ্চে তার দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। থিয়েটারের অভিজ্ঞতা তাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলে এবং তার অভিনয় জীবনকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করে।
ক্যারিয়ার
যশ তার ক্যারিয়ার শুরু করেন টেলিভিশনে। ২০০৪ সালে তিনি 'নন্দা গোকুলা' নামক একটি জনপ্রিয় কন্নড় টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করেন। এরপর 'প্রীতি ইল্লাদা মেলে' এবং 'শিব' এর মতো আরও কয়েকটি ধারাবাহিকে তাকে দেখা যায়। টেলিভিশনে তার জনপ্রিয়তা তাকে চলচ্চিত্রের দিকে নিয়ে যায়।
টেলিভিশন থেকে চলচ্চিত্রে
২০০৭ সালে যশ 'জাম্বাদা হুদুগি' ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন। তবে, তার প্রথম উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল ২০০৮ সালের চলচ্চিত্র 'মোগ্গিনা মানাসু'তে, যেখানে তিনি তার ভবিষ্যৎ স্ত্রী রাধিকা পণ্ডিতের সাথে অভিনয় করেন। এই ছবিতে তার অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতে নেন। এরপর তিনি 'রকি', 'কল্লারা শান্তে' এবং 'গোকুলা' এর মতো ছবিগুলিতে অভিনয় করেন, যা তাকে কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পে একজন প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
সফলতার সিঁড়ি
২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'রাজধানী' ছবিটি যশের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই অ্যাকশন-ড্রামা ছবিটি বক্স অফিসে ভালো ব্যবসা করে এবং সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। এরপর 'কিরতাকা' (২০১১), 'লাকি' (২০১২) এবং 'জানু' (২০১২) এর মতো সফল ছবিগুলিতে অভিনয় করেন। ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'গোগলি' ছবিটি তাকে বাণিজ্যিক সাফল্য এবং সমালোচকদের প্রশংসা উভয়ই এনে দেয়। এই ছবিতে তার রোমান্টিক এবং অ্যাকশন অবতার দর্শকদের মন জয় করে। ২০১৪ সালে 'মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামচারি' মুক্তি পায়, যা কন্নড় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ আয়কারী ছবিতে পরিণত হয় এবং যশের স্টারডমকে আরও দৃঢ় করে।
কে.জি.এফ: এক নতুন দিগন্ত
২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রশান্ত নীল পরিচালিত 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ১' যশের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক। এই ছবিটি কন্নড়, হিন্দি, তেলুগু, তামিল এবং মালয়ালম ভাষায় মুক্তি পেয়ে প্যান-ইন্ডিয়া হিট হয়। ছবিতে রকি ভাই চরিত্রে যশের অভিনয় তাকে রাতারাতি জাতীয় তারকা বানিয়ে দেয়। তার ডায়লগ ডেলিভারি, স্টাইল এবং অ্যাকশন সিকোয়েন্স ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ছবিটি বক্স অফিসে বিশ্বব্যাপী ২৫০ কোটি টাকার বেশি আয় করে।
২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ২' পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙে দেয়। এটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী ছবিতে পরিণত হয় এবং বিশ্বব্যাপী ১০০০ কোটি টাকারও বেশি আয় করে। এই ছবির মাধ্যমে যশ নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক সুপারস্টার হিসেবে প্রমাণ করেন এবং কন্নড় চলচ্চিত্রকে বিশ্ব দরবারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। কে.জি.এফ ফ্র্যাঞ্চাইজি শুধুমাত্র যশের ক্যারিয়ারকেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পকেও এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- 'মোগ্গিনা মানাসু' (২০০৮) ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ।
- 'মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রামচারি' (২০১৪) ছবির জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ।
- 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ১' (২০১৮) ছবির জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস সাউথ এবং SIIMA অ্যাওয়ার্ডস।
- 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ২' (২০২২) ছবির জন্য একাধিক সেরা অভিনেতার পুরস্কার।
- বক্স অফিস সাফল্যের মাধ্যমে কন্নড় চলচ্চিত্রকে প্যান-ইন্ডিয়া স্তরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন।
- ২০২০ সালে ফোর্বস ইন্ডিয়ার 'সেলিব্রিটি ১০০' তালিকায় স্থান লাভ।
ব্যক্তিগত জীবন
যশ তার দীর্ঘদিনের সহ-অভিনেত্রী রাধিকা পণ্ডিতের সাথে ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সম্পর্ক 'মোগ্গিনা মানাসু' ছবির সেট থেকে শুরু হয়েছিল এবং তারা বেশ কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন। এই দম্পতির দুটি সন্তান রয়েছে - একটি মেয়ে, আইরা এবং একটি ছেলে, ইয়াথারভ। যশ তার পরিবারকে অত্যন্ত ভালোবাসেন এবং প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের ছবি শেয়ার করেন। তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষ থেকে দূরে রাখতে পছন্দ করেন, তবে ভক্তদের কাছে তার পারিবারিক বন্ধন খুবই প্রিয়।
মজার তথ্য
- যশ তার আসল নাম নবীন কুমার গৌড়ার পরিবর্তে 'যশ' মঞ্চনামটি গ্রহণ করেন, যা তার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে।
- অভিনয় জগতে আসার আগে তিনি থিয়েটারে একজন ব্যাকস্টেজ কর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং দিনে ৫০ টাকা আয় করতেন।
- তিনি একজন স্বঘোষিত রজনীকান্ত ভক্ত এবং প্রায়শই রজনীকান্তকে তার অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
- যশ 'যশ পথ ফাউন্ডেশন' (Yashomarga Foundation) নামে একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা কর্ণাটকের কৃষকদের এবং পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে কাজ করে।
- 'কে.জি.এফ' ছবির জন্য তিনি তার লুক এবং ডায়লগ ডেলিভারির উপর ব্যাপক কাজ করেছিলেন, যা তার চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করে।
উপসংহার
যশ, একজন সাধারণ বাসের চালকের ছেলে থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের একজন মেগাস্টার হয়ে ওঠার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। তার কঠোর পরিশ্রম, প্রতিভা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। 'কে.জি.এফ' ফ্র্যাঞ্চাইজি তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছে এবং তিনি কন্নড় চলচ্চিত্রকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যশ শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি একজন অনুপ্রেরণা, যিনি প্রমাণ করেছেন যে স্বপ্ন পূরণের জন্য কোনো বাধাই বড় নয়। তার ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলি নিয়ে ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, এবং আশা করা যায় তিনি আরও বড় সাফল্য অর্জন করবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: অভিনেতা যশের আসল নাম কি?
উত্তর: অভিনেতা যশের আসল নাম হলো নবীন কুমার গৌড়া। মঞ্চে তিনি যশ নামেই পরিচিতি লাভ করেছেন, যা তার ক্যারিয়ারের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছে।
প্রশ্ন: যশ কোন চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত?
উত্তর: যশ মূলত 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ১' এবং 'কে.জি.এফ: চ্যাপ্টার ২' এই দুটি চলচ্চিত্রের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই ছবিগুলোতে 'রকি ভাই' চরিত্রে তার অভিনয় তাকে প্যান-ইন্ডিয়া সুপারস্টার বানিয়েছে।
প্রশ্ন: যশের স্ত্রী কে এবং তাদের কতজন সন্তান আছে?
উত্তর: যশের স্ত্রী হলেন সহ-অভিনেত্রী রাধিকা পণ্ডিত। তাদের দুটি সন্তান আছে - একটি মেয়ে যার নাম আইরা এবং একটি ছেলে যার নাম ইয়াথারভ।
প্রশ্ন: যশ কোন চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করেন?
উত্তর: যশ মূলত কন্নড় চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করেন। তবে 'কে.জি.এফ' ফ্র্যাঞ্চাইজির সাফল্যের পর তিনি সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে একজন পরিচিত মুখ।
প্রশ্ন: যশ কি কোনো দাতব্য কাজ করেন?
উত্তর: হ্যাঁ, যশ 'যশ পথ ফাউন্ডেশন' (Yashomarga Foundation) নামে একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সংস্থা কর্ণাটকের কৃষকদের সহায়তা এবং পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে কাজ করে।
প্রশ্ন: যশের জন্ম তারিখ এবং জন্মস্থান কোথায়?
উত্তর: যশ ১৯৮৬ সালের ৮ জানুয়ারি কর্ণাটকের হাসান জেলার বুভানাহাল্লি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন