Full width home advertisement

Featured Actors

Popular Biographies

Post Page Advertisement [Top]

তথ্যসারণি

পূর্ণ নাম সাবিনা ইয়াসমিন
পেশা সঙ্গীতশিল্পী, গায়িকা
জাতীয়তা বাংলাদেশী
জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪
জন্মস্থান ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)
উল্লেখযোগ্য কিংবদন্তী প্লেব্যাক গায়িকা, অসংখ্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী
উল্লেখযোগ্য গান "সব ক'টা জানালা খুলে দাও না", "ও আমার বাংলা মা", "মাঝি নাও ছাড়িয়া দে", "এই পৃথিবীর পরে", "তুমি তো আমারই", "শুধু গান গেয়ে পরিচয়"

পরিচিতি

সাবিনা ইয়াসমিন, বাংলা সঙ্গীতের এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি তার সুমধুর কণ্ঠ আর অসাধারণ গায়কী দিয়ে কয়েক দশক ধরে মুগ্ধ করে রেখেছেন কোটি কোটি শ্রোতাকে। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে তিনি কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি এক প্রতিষ্ঠান, এক কিংবদন্তী। তার কণ্ঠের জাদুতে অসংখ্য গান পেয়েছে অমরত্ব, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলেছে। বিশেষ করে দেশাত্মবোধক গান এবং চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা গানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন, যার প্রভাব আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

Sabina Yasmin

Photo: Wikimedia Commons
View Source

প্রারম্ভিক জীবন

১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঢাকা শহরে সাবিনা ইয়াসমিনের জন্ম। এক সম্ভ্রান্ত সঙ্গীত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা লুৎফর রহমান এবং মা বেগম মৌলুদা খাতুন ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী। তার তিন বোন – ফরিদা ইয়াসমিন, নীলুফার ইয়াসমিন এবং উম্মে কুলসুম (মিতা হক) – প্রত্যেকেই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতশিল্পী। এই সঙ্গীতময় পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার গভীর টান ছিল। পারিবারিক অনুপ্রেরণা এবং সঙ্গীতের প্রতি সহজাত ভালোবাসা তাকে শৈশবেই সঙ্গীতের পথে নিয়ে আসে।

মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসম্মুখে গান পরিবেশন করেন। তার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিনের কাছেই তার সঙ্গীতের হাতেখড়ি। এরপর তিনি ওস্তাদ পিসি গোমেজ, ওস্তাদ মীর কাশেম খান এবং ওস্তাদ লাবু মিয়ার মতো প্রখ্যাত গুরুদের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন। এই গভীর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জ্ঞান তার গায়েকীকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল, যা তাকে পরবর্তীতে একজন পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

শিক্ষাজীবন

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গীতের প্রতি ছিল অগাধ নিষ্ঠা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তার জীবনের মূল লক্ষ্য এবং ধ্যানজ্ঞান ছিল সঙ্গীত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাকে জীবনের অন্যান্য দিক সম্পর্কে ধারণা দিলেও, তার আত্মার খোরাক জুগিয়েছে সঙ্গীত সাধনা। তার শিক্ষাজীবন প্রমাণ করে যে, একজন শিল্পী কেবল তার শিল্পচর্চায় ডুবে থাকেন না, বরং জ্ঞানার্জনেও তিনি সমান আগ্রহী হতে পারেন।

ক্যারিয়ার

সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গীত ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল অত্যন্ত অল্প বয়সে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে তিনি এহতেশাম পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন। যদিও তার প্রথম রেকর্ডকৃত গান ছিল ১৯৬৪ সালে, যখন তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে গান গেয়েছিলেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সঙ্গীতের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী। হাজার হাজার গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাকে অমর করে রেখেছে।

তার গাওয়া অসংখ্য গান কালজয়ী হয়েছে। দেশাত্মবোধক গানে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। "সব ক'টা জানালা খুলে দাও না", "ও আমার বাংলা মা", "একটি বাংলাদেশ তুমি"-এর মতো গানগুলো আজও বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের শিখা প্রজ্বলিত করে। আধুনিক গান, ধ্রুপদী গান, লোকগীতি – সব ধরনের গানেই তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার কণ্ঠের স্বকীয়তা, সুরের গভীরতা এবং গানের প্রতিটি শব্দকে প্রাণবন্ত করার ক্ষমতা তাকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি শুধু গানের কথা গেয়ে যাননি, বরং প্রতিটি গানের আত্মাকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তার গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর দেশের পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছে। তিনি বহু দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন যা আজও জাতীয় দিবসগুলোতে বাজানো হয়। এছাড়া, তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে গান পরিবেশন করে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন। তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকারের সাথে কাজ করেছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন আলাউদ্দিন আলী, সত্য সাহা, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, খান আতাউর রহমান প্রমুখ।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গীত জীবনে অর্জনের তালিকা দীর্ঘ ও গৌরবময়। তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬) লাভ করেছেন। এছাড়া, তিনি ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, যা একক শিল্পী হিসেবে সর্বোচ্চ। এই পুরস্কারগুলো তার অসামান্য সঙ্গীত প্রতিভার স্বীকৃতি।

  • স্বাধীনতা পুরস্কার: ১৯৯৬ সালে সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য।
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: ১৪ বার (১৯৭৭, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৮, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৭, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮)।
  • একুশে পদক: (যদিও তথ্যসারণিতে উল্লেখ নেই, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, যদি স্মরণে থাকে তবে যোগ করা যেতে পারে। তবে আমি এখানে শুধু নিশ্চিত তথ্য দিচ্ছি)।
  • বাচসাস পুরস্কার: বহুবার।
  • মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: আজীবন সম্মাননা সহ একাধিক পুরস্কার।
  • এছাড়াও, তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন, যা তার কর্মজীবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ব্যক্তিগত জীবন

সাবিনা ইয়াসমিনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল কিছুটা ঘটনাবহুল। তিনি প্রথম বিয়ে করেন এক সরকারি কর্মকর্তাকে। পরবর্তীতে তিনি চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রবীর মিত্রকে বিয়ে করেন, কিন্তু সেই সম্পর্কও স্থায়ী হয়নি। এরপর তিনি জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকার কবীর সুমনকে বিয়ে করেন। তবে এই সম্পর্কও বেশিদিন টেকেনি। তার ব্যক্তিগত জীবনের এই উত্থান-পতন তার সঙ্গীত জীবনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। বরং তিনি তার সমস্ত আবেগ ও অনুভূতিকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করে গেছেন। তিনি তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে জীবনযাপন করেছেন এবং সঙ্গীত সাধনাতেই নিজেকে নিবিষ্ট রেখেছেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও তার শিল্পীসত্তা এবং সঙ্গীতই তার প্রধান পরিচয়।

মজার তথ্য

  • সাবিনা ইয়াসমিন বাংলা ও উর্দু সহ প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক গান গাওয়া শিল্পীদের একজন হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
  • তিনি একই দিনে প্রায় ১৬টি গান রেকর্ড করার বিরল রেকর্ড গড়েছিলেন, যা তার কর্মনিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য উদাহরণ।
  • তার গাওয়া "সব ক'টা জানালা খুলে দাও না" গানটি বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
  • তিনি শুধু বাংলা চলচ্চিত্রেই নয়, ওপার বাংলার চলচ্চিত্রেও প্লেব্যাক করেছেন এবং সেখানেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন।

উপসংহার

সাবিনা ইয়াসমিন বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে এক চিরভাস্বর নাম। তার কণ্ঠের মাধুর্য, গানের প্রতি তার নিবেদন এবং দীর্ঘ সঙ্গীত জীবন তাকে এক কিংবদন্তীর আসনে বসিয়েছে। তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, তিনি বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। তার গাওয়া গানগুলো বাঙালির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা এবং দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তিনি এক অনুপ্রেরণা এবং বাংলা গানের শ্রোতাদের জন্য তিনি এক অফুরন্ত ভালোবাসার উৎস। সাবিনা ইয়াসমিনের অবদান বাংলা সঙ্গীতকে করেছে সমৃদ্ধ এবং তার সুরের জাদুতে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন আপামর বাঙালির হৃদয়ে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিন কতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন?

উত্তর: সাবিনা ইয়াসমিন তার বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে রেকর্ড সংখ্যক ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন। এটি একক শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তির রেকর্ড।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিনের কয়েকটি জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানের নাম কী?

উত্তর: সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে রয়েছে "সব ক'টা জানালা খুলে দাও না", "ও আমার বাংলা মা", "একটি বাংলাদেশ তুমি", "সুন্দর সুবর্ণ" এবং "মাঝি নাও ছাড়িয়া দে"। এই গানগুলো আজও বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের শিখা প্রজ্বলিত করে।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিন কবে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন?

উত্তর: সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এটি তার কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান অর্জন।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিনের প্রথম প্লেব্যাক করা চলচ্চিত্র কোনটি?

উত্তর: সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন। যদিও শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি ১৯৬৪ সালে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে গান গেয়েছিলেন।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিন কতগুলো গান গেয়েছেন?

উত্তর: সাবিনা ইয়াসমিন বাংলা ও উর্দু সহ প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক গান তাকে বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক গান গাওয়া শিল্পীদের একজন হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিনের বোনেরা কি সঙ্গীতশিল্পী?

উত্তর: হ্যাঁ, সাবিনা ইয়াসমিনের তিন বোনই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতশিল্পী। তার বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন, নীলুফার ইয়াসমিন এবং উম্মে কুলসুম (মিতা হক) প্রত্যেকেই বাংলা সঙ্গীতে অবদান রেখেছেন।

প্রশ্ন: সাবিনা ইয়াসমিন কি এখনও সঙ্গীত জগতে সক্রিয় আছেন?

উত্তর: সাবিনা ইয়াসমিন এখনও সঙ্গীত জগতে সক্রিয় আছেন, যদিও তার ব্যস্ততা আগের চেয়ে কম। তিনি মাঝে মাঝে নতুন গান রেকর্ড করেন, স্টেজ শোতে অংশ নেন এবং বিভিন্ন সঙ্গীত অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে উপস্থিত থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Bottom Ad [Post Page]