তথ্যসারণি
| পূর্ণ নাম | ললিসা মনোবাল |
|---|---|
| পরিচিত নাম | লিসা |
| জাতীয়তা | থাই |
| জন্মস্থান | বুরিরাম, থাইল্যান্ড |
| জন্ম তারিখ | ২৭ মার্চ, ১৯৯৭ |
| পেশা | র্যাপার, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী, মডেল |
| উল্লেখযোগ্য | ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর সদস্য |
| সংস্থা | ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্ট (YG Entertainment) |
| উচ্চতা | প্রায় ১৬৭ সেমি (৫ ফুট ৫ ইঞ্চি) |
পরিচিতি
ললিসা মনোবাল, বিশ্বজুড়ে যিনি লিসা নামেই অধিক পরিচিত, একজন থাই র্যাপার, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী এবং মডেল। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় মেয়েদের ব্যান্ড ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন। তার অসাধারণ নৃত্যশৈলী, শক্তিশালী র্যাপিং এবং অনন্য ফ্যাশন সেন্সের কারণে তিনি কে-পপ শিল্পের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। লিসা শুধু দক্ষিণ কোরিয়া বা থাইল্যান্ডেই নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য ভক্তদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। তার ক্যারিশম্যাটিক মঞ্চ উপস্থিতি এবং বহুমুখী প্রতিভা তাকে আন্তর্জাতিক পপ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করেছে।
Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
ললিসা মনোবাল ১৯৯৭ সালের ২৭শে মার্চ থাইল্যান্ডের বুরিরাম প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মগত নাম ছিল প্রাণপ্রিয়া মনোবাল, যা পরে আইনিভাবে ললিসা মনোবালে পরিবর্তন করা হয়। শৈশব থেকেই লিসা নাচ এবং গানের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। মাত্র ৪ বছর বয়স থেকেই তিনি নাচ শেখা শুরু করেন এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। থাইল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি বেশ কয়েকটি নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন এবং প্রায়শই বিজয়ী হতেন। তার প্রতিভা এবং স্বপ্ন তাকে কে-পপ তারকা হওয়ার দিকে ধাবিত করে।
লিসা তার কৈশোরে কে-পপ শিল্পে প্রবেশ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০১০ সালে, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম বৃহৎ বিনোদন সংস্থা ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্ট (YG Entertainment)-এর থাইল্যান্ডে আয়োজিত অডিশনে অংশ নেন। হাজার হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি একাই নির্বাচিত হন, যা তার অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ। ২০১১ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান এবং ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টের অধীনে একজন প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে তার যাত্রা শুরু করেন।
শিক্ষাজীবন
লিসা তার প্রাথমিক শিক্ষা থাইল্যান্ডের প্রাফামনตรี স্কুল ১ এবং ২-এ সম্পন্ন করেন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টে যোগদানের পর, তার শিক্ষাজীবন মূলত সংগীত এবং পারফর্মিং আর্টসের উপর নিবদ্ধ ছিল। একজন কে-পপ প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে, তাকে কঠোর প্রশিক্ষণ সূচির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, যেখানে গান, নাচ, র্যাপিং এবং বিভিন্ন ভাষা শেখার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এই সময় তিনি কোরিয়ান ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি এবং জাপানিজ ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেন, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে। তার শিক্ষাজীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং নিরলস সাধনার এক প্রতিচ্ছবি, যা তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছে।
ক্যারিয়ার
ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর সাথে উত্থান
লিসা ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টে প্রায় পাঁচ বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাকে একজন শক্তিশালী র্যাপার, নৃত্যশিল্পী এবং গায়িকা হিসেবে প্রস্তুত করে তোলে। অবশেষে, ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে তিনি ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ব্ল্যাকপিঙ্ক দ্রুত কে-পপ বিশ্বের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় মেয়েদের ব্যান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাদের প্রথম একক অ্যালবাম স্কয়ার ওয়ান (Square One)-এর গান হুইসেল (Whistle) এবং বুম্বায়াহ (Boombayah) বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। লিসা তার র্যাপিং দক্ষতা এবং শক্তিশালী নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে ব্যান্ডের পারফরম্যান্সে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও সলো ক্যারিয়ার
ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর ধারাবাহিক সাফল্যের সাথে সাথে লিসার পরিচিতিও বাড়তে থাকে। ডু-ডু ডু-ডু (DDU-DU DDU-DU), কিল দিস লাভ (Kill This Love), হাউ ইউ লাইক দ্যাট (How You Like That)-এর মতো হিট গানগুলো তাদের আন্তর্জাতিক তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ব্ল্যাকপিঙ্ক প্রথম কে-পপ মেয়েদের ব্যান্ড হিসেবে কোয়াচেলা মিউজিক ফেস্টিভ্যালে পারফর্ম করে এবং ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি সাবস্ক্রাইব করা মিউজিক গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে ওঠে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, লিসা তার বহু প্রতীক্ষিত সলো অ্যালবাম ললিসা (LALISA) প্রকাশ করেন। এই অ্যালবামের টাইটেল ট্র্যাক ললিসা এবং বি-সাইড ট্র্যাক মানি (MONEY) বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ভেঙে দেয়। ললিসা মিউজিক ভিডিওটি ইউটিউবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে একক শিল্পীর দ্বারা সবচেয়ে বেশি দেখা মিউজিক ভিডিওর রেকর্ড গড়ে। তার সলো আত্মপ্রকাশ তাকে এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং এমটিভি ইউরোপ মিউজিক অ্যাওয়ার্ড জেতা প্রথম কে-পপ একক শিল্পী হিসেবে ইতিহাস তৈরি করে।
ফ্যাশন ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর
লিসা শুধুমাত্র একজন শিল্পীই নন, তিনি একজন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকনও। তার স্টাইলিশ পোশাক এবং ফ্যাশন সেন্স তাকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তিনি সেলিন (Celine), বুলগারি (Bulgari), ম্যাক কসমেটিকস (MAC Cosmetics)-এর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করেছেন। তার ফ্যাশন প্রভাব তাকে অসংখ্য ম্যাগাজিন কভার এবং ফ্যাশন শোতে উপস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছে।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর সদস্য হিসেবে একাধিক বিশ্ব রেকর্ড এবং চার্ট-টপিং সাফল্য।
- একক শিল্পী হিসেবে ললিসা মিউজিক ভিডিওর জন্য ইউটিউবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ভিউয়ের রেকর্ড।
- প্রথম কে-পপ একক শিল্পী হিসেবে এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং এমটিভি ইউরোপ মিউজিক অ্যাওয়ার্ড জয়।
- ফোর্বস এশিয়া কর্তৃক '৩০ আন্ডার ৩০' তালিকায় স্থান লাভ।
- বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফ্যাশন আইকন এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর।
- দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরে থেকে আসা কে-পপ শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম সফল তারকা।
ব্যক্তিগত জীবন
লিসা তার ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে খুব বেশি প্রকাশ করেন না, তবে তার ভক্তদের কাছে তার কিছু দিক বেশ পরিচিত। তিনি থাই, কোরিয়ান, ইংরেজি এবং জাপানিজ ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। লিসা একজন প্রাণিপ্রেমী এবং তার বেশ কয়েকটি বিড়াল রয়েছে, যাদের নাম লিউ, লুকা, লিলি, লিওন, এবং লগো। তিনি প্রায়শই তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার পোষা প্রাণীদের ছবি শেয়ার করেন। লিসার পরিবার থাইল্যান্ডে বসবাস করে এবং তিনি প্রায়শই তাদের সাথে দেখা করতে দেশে ফিরে যান। তার বিনয়ী এবং বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের কারণে তিনি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
মজার তথ্য
- লিসার ডাকনামের মধ্যে লিমারিও এবং পুপু বেশ জনপ্রিয়।
- তিনি একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার এবং তার অবসর সময়ে ছবি তুলতে ভালোবাসেন।
- লিসা থাই খাবার খেতে খুব পছন্দ করেন এবং প্রায়শই তার পছন্দের খাবারের কথা শেয়ার করেন।
- ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগে, তিনি বিগ ব্যাং (BIGBANG)-এর তাইয়াং-এর ওয়েডিং ড্রেস (Wedding Dress) মিউজিক ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবে পারফর্ম করেছিলেন।
- তিনি চীনের রিয়েলিটি শো ইউথ উইথ ইউ (Youth With You)-এর একজন ডান্স মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন, যেখানে তিনি তার অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান শেয়ার করেছেন।
উপসংহার
লিসা (ললিসা মনোবাল) একজন অসাধারণ প্রতিভাবান শিল্পী, যিনি তার কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য, এবং একক শিল্পী হিসেবেও তিনি নিজের একটি শক্তিশালী পরিচয় তৈরি করেছেন। তার ফ্যাশন প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক অবদান তাকে শুধুমাত্র একজন কে-পপ আইকন হিসেবে নয়, বরং একজন বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লিসার গল্প প্রমাণ করে যে স্বপ্ন পূরণের জন্য কোনো সীমানা নেই, এবং তার যাত্রা বিশ্বজুড়ে তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার আরও উজ্জ্বল হবে বলে আশা করা যায়, যেখানে তিনি নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করবেন এবং তার ভক্তদের মুগ্ধ করে যাবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: লিসার আসল নাম কী?
উত্তর: লিসার আসল নাম ললিসা মনোবাল। জন্মগতভাবে তার নাম ছিল প্রাণপ্রিয়া মনোবাল, যা পরে আইনিভাবে পরিবর্তন করা হয়।
প্রশ্ন: লিসার জাতীয়তা কী?
উত্তর: লিসা থাইল্যান্ডের নাগরিক। তিনি থাইল্যান্ডের বুরিরাম প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন।
প্রশ্ন: লিসা ব্ল্যাকপিঙ্ক-এর কোন অবস্থানে আছেন?
উত্তর: ব্ল্যাকপিঙ্ক-এ লিসা প্রধান নৃত্যশিল্পী (Main Dancer), প্রধান র্যাপার (Lead Rapper) এবং সাব-ভোকালিস্ট (Sub-Vocalist) হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন: লিসার জনপ্রিয় একক গানগুলো কী কী?
উত্তর: লিসার সবচেয়ে জনপ্রিয় একক গানগুলো হলো ললিসা (LALISA) এবং মানি (MONEY)। এই গানগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রশ্ন: লিসা কয়টি ভাষায় কথা বলতে পারেন?
উত্তর: লিসা চারটি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন: থাই, কোরিয়ান, ইংরেজি এবং জাপানিজ।
প্রশ্ন: লিসার পোষা প্রাণী আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, লিসা একজন প্রাণিপ্রেমী এবং তার বেশ কয়েকটি বিড়াল রয়েছে। তাদের নাম হলো লিউ, লুকা, লিলি, লিওন, এবং লগো।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে লিসা কতটা জনপ্রিয়?
উত্তর: বাংলাদেশে লিসা এবং ব্ল্যাকপিঙ্ক অত্যন্ত জনপ্রিয়। কে-পপ ভক্তদের মধ্যে তার বিশাল ফ্যানবেস রয়েছে এবং তার গান ও ফ্যাশন ট্রেন্ড বাংলাদেশের তরুণদের প্রভাবিত করে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন