Full width home advertisement

Featured Actors

Popular Biographies

Post Page Advertisement [Top]

আর্থহীন: বাংলাদেশের রক সঙ্গীতের এক কিংবদন্তী ব্যান্ড

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে আর্থহীন একটি পরিচিত নাম, একটি আবেগ, একটি কিংবদন্তী। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে গঠিত এই ব্যান্ডটি খুব দ্রুতই নিজেদের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে নেয়। তাদের সঙ্গীত কেবল সুর আর তাল নয়, বরং গভীর লিরিক্স এবং শক্তিশালী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। হেভি মেটাল, হার্ড রক, এবং ফিউশন ধারার মিশ্রণে আর্থহীন তৈরি করেছে এমন এক সঙ্গীত যা একইসাথে আক্রমণাত্মক এবং হৃদয়গ্রাহী।

Aurthohin

Photo: Wikimedia Commons
View Source

তথ্যসারণি

বিবরণ তথ্য
ব্যান্ডের নাম আর্থহীন (Aurthohin)
প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯৮/১৯৯৯ (আনুমানিক)
উৎপত্তি ঢাকা, বাংলাদেশ
ধরণ হেভি মেটাল, হার্ড রক, ফিউশন, ব্লুজ
সক্রিয় বছর ১৯৯৯ – বর্তমান
উল্লেখযোগ্য সদস্য সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন (বেজ, ভোকাল), শিশির আহমেদ (গিটার, কিবোর্ড), রাফা (ড্রামস, ভোকাল), তিতি (গিটার)
পরিচিতির কারণ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী রক/মেটাল ব্যান্ড

পরিচিতি

আর্থহীন, বাংলা রক সঙ্গীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সদস্য সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন, যিনি ‘বেজবাবা’ সুমন নামেই অধিক পরিচিত। তার নেতৃত্বে এই ব্যান্ডটি বাংলাদেশে রক ও মেটাল সঙ্গীতের ধারাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাদের গানগুলো কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, বরং জীবন, সমাজ, প্রেম এবং বিরহ নিয়ে গভীর ভাবনা প্রকাশ করে। আর্থহীন-এর সঙ্গীত তাদের শ্রোতাদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে, যা একইসাথে শক্তিশালী এবং আবেগপ্রবণ। তাদের ব্যতিক্রমী লিরিক্স এবং সুমনের বেজ বাজানোর অনন্য শৈলী ব্যান্ডটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।

প্রারম্ভিক জীবন ও গঠন

আর্থহীন-এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে বা ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে, সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমনের হাত ধরে। তিনি মূলত একটি একক অ্যালবাম তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াতেই একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড গঠনের ধারণা আসে। সুমনের দীর্ঘদিনের সঙ্গীত অভিজ্ঞতা এবং তার নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা এই ব্যান্ডের ভিত্তি স্থাপন করে। প্রাথমিকভাবে কিছু পরীক্ষামূলক কাজ এবং সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে আর্থহীন তার নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলে। প্রথমদিকে বিভিন্ন সদস্য পরিবর্তন হলেও, সুমনের নেতৃত্ব এবং ব্যান্ডের মূল দর্শন অপরিবর্তিত ছিল। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘ত্রিমাত্রিক’ প্রকাশের মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা সঙ্গীত জগতে প্রবেশ করে এবং দ্রুতই শ্রোতাদের নজর কাড়ে।

ক্যারিয়ার

আর্থহীন-এর সঙ্গীত ক্যারিয়ার এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘ত্রিমাত্রিক’ (২০০০) প্রকাশের পর থেকেই তারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই অ্যালবামের গানগুলো বাংলা রক সঙ্গীতের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরপর ‘বিধ্বংসী’ (২০০১), ‘অসমাপ্ত’ (২০০৩), এবং ‘ধ্রুবক’ (২০০৬) এর মতো অ্যালবামগুলো একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখে। প্রতিটি অ্যালবামেই আর্থহীন তাদের সঙ্গীত শৈলীতে নতুনত্বের ছাপ রেখেছে, যা তাদের শ্রোতাদের কাছে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আর্থহীন কেবল স্টুডিও অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য লাইভ কনসার্টে অংশ নিয়েছে। তাদের লাইভ পারফরম্যান্সগুলো তাদের শক্তিশালী বাদ্যযন্ত্রের দক্ষতা এবং সুমনের ক্যারিশম্যাটিক মঞ্চ উপস্থিতির জন্য সুপরিচিত। ব্যান্ডটি বিভিন্ন সময় তাদের লাইনআপে পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু সুমনের সাথে শিশির আহমেদ (গিটার, কিবোর্ড), রাফা (ড্রামস, ভোকাল) এবং তিতি (গিটার)-এর মতো প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পীদের আগমন ব্যান্ডটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। রাফার ড্রামিং এবং ভোকাল, শিশিরের গিটার ও কিবোর্ডের দক্ষতা এবং তিতির গিটার বাজানোর শৈলী আর্থহীন-এর সঙ্গীতকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

তাদের গানগুলো প্রায়শই সামাজিক অসঙ্গতি, ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং মানবিক আবেগকে তুলে ধরে, যা শ্রোতাদের সাথে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করে। ‘মাঝে মাঝে’, ‘চায় না’, ‘আমার পৃথিবী’, ‘গন্তব্য’ এবং ‘এ কেমন বিদায়’ এর মতো গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। সুমনের অসুস্থতার কারণে ব্যান্ডটি কিছু সময়ের জন্য বিরতিতে থাকলেও, তার দৃঢ় সংকল্প এবং ভক্তদের ভালোবাসায় তারা আবার ফিরে আসে এবং নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

আর্থহীন বাংলা রক এবং মেটাল সঙ্গীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো:

  • স্বতন্ত্র সঙ্গীত শৈলী: বেজ গিটারকে মূল বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সুমন এক নতুন ধারা তৈরি করেছেন, যা বাংলা সঙ্গীতে বিরল।
  • দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা: দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্থহীন তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, যা বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতে একটি বিরল ঘটনা।
  • প্রভাবশালী অ্যালবাম: ‘ত্রিমাত্রিক’, ‘বিধ্বংসী’, ‘অসমাপ্ত’ এবং ‘ধ্রুবক’ এর মতো অ্যালবামগুলো বাংলা রক সঙ্গীতের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
  • প্রজন্মের অনুপ্রেরণা: আর্থহীন অসংখ্য তরুণ সঙ্গীতশিল্পী এবং ব্যান্ডকে রক সঙ্গীত চর্চায় অনুপ্রাণিত করেছে।
  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: দেশের বাইরেও বিভিন্ন কনসার্টে অংশ নিয়ে তারা বাংলাদেশের রক সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করিয়েছে।
  • কঠিন সময়ে ফিরে আসা: সুমনের গুরুতর অসুস্থতার পর ব্যান্ডটির সফল প্রত্যাবর্তন তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং ভক্তদের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

ব্যক্তিগত জীবন (ব্যান্ডের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা)

একটি ব্যান্ড হিসেবে আর্থহীন-এর ব্যক্তিগত জীবন বলতে এর সদস্যদের মধ্যেকার সম্পর্ক, তাদের সৃজনশীল প্রক্রিয়া এবং সময়ের সাথে সাথে ব্যান্ডটির বিবর্তনকে বোঝায়। সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন, যিনি ব্যান্ডের প্রাণ, তার নেতৃত্বগুণ এবং সঙ্গীত প্রতিভার কারণে আর্থহীন একটি সুসংহত দলে পরিণত হয়েছে। ব্যান্ডের সদস্যরা কেবল সহকর্মীই নন, বরং একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের মধ্যেকার বোঝাপড়া এবং একে অপরের প্রতি সমর্থনই আর্থহীনকে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে সুমনের অসুস্থতার মতো কঠিন সময়ে।

ব্যান্ডের সদস্যরা প্রায়শই তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং জীবনদর্শন তাদের গানে প্রতিফলিত করেন। এই ব্যক্তিগত ছোঁয়া তাদের সঙ্গীতকে আরও বেশি খাঁটি এবং আবেগপূর্ণ করে তোলে। রিহার্সাল, রেকর্ডিং সেশন এবং ট্যুরিং-এর সময় তাদের মধ্যে যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৃজনশীল আদান-প্রদান হয়, তা আর্থহীন-এর প্রতিটি গানেই স্পষ্ট। এই অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা এবং ব্যক্তিগত বন্ধনই আর্থহীনকে কেবল একটি ব্যান্ড নয়, বরং একটি পরিবারের মতো করে গড়ে তুলেছে।

মজার তথ্য

  • ‘বেজবাবা’ সুমন তার ব্যতিক্রমী বেজ বাজানোর শৈলীর জন্য পরিচিত। তিনি বেজ গিটারকে কেবল রিদম যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং প্রধান সুরের যন্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করেন।
  • সুমন তার গানে প্রায়শই বাংলা এবং ইংরেজি শব্দের মিশ্রণ ঘটান, যা তার গানের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
  • আর্থহীন-এর সদস্যরা প্রায়শই তাদের কনসার্টে ভক্তদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন, যা তাদের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
  • সুমন একবার বলেছিলেন যে, আর্থহীন নামের অর্থ হলো ‘অর্থহীন’ নয়, বরং ‘অর্থপূর্ণ’ যা জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে বের করে।
  • ব্যান্ডটি বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কাজেও অংশ নিয়েছে, যা তাদের মানবিক দিকটি তুলে ধরে।
  • সুমন তার দীর্ঘ অসুস্থতা থেকে ফিরে আসার পর নতুন উদ্যমে সঙ্গীত চর্চা শুরু করেন, যা অসংখ্য ভক্তকে অনুপ্রাণিত করেছে।

উপসংহার

আর্থহীন কেবল একটি ব্যান্ড নয়, এটি বাংলা রক সঙ্গীতের এক জীবন্ত কিংবদন্তী। তাদের সঙ্গীত কেবল কানে শোনা নয়, বরং আত্মায় অনুভব করার মতো। সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন এবং তার ব্যান্ডের সদস্যরা তাদের অদম্য প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং সঙ্গীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে বাংলা সঙ্গীত জগতে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখেছেন। তাদের গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করবে এবং বাংলা রক সঙ্গীতের ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর্থহীন প্রমাণ করেছে যে, সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, এটি জীবন ও আবেগের এক শক্তিশালী প্রকাশ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: আর্থহীন ব্যান্ড কবে গঠিত হয়েছিল?

উত্তর: আর্থহীন ব্যান্ড ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে, আনুমানিক ১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সালে সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমনের হাত ধরে গঠিত হয়েছিল।

প্রশ্ন: আর্থহীন ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা কারা?

উত্তর: আর্থহীন ব্যান্ডের উল্লেখযোগ্য বর্তমান সদস্যরা হলেন সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন (বেজ, ভোকাল), শিশির আহমেদ (গিটার, কিবোর্ড), রাফা (ড্রামস, ভোকাল) এবং তিতি (গিটার)।

প্রশ্ন: আর্থহীন কোন ধরনের সঙ্গীত পরিবেশন করে?

উত্তর: আর্থহীন মূলত হেভি মেটাল, হার্ড রক, ফিউশন এবং ব্লুজ ধারার সঙ্গীত পরিবেশন করে। তাদের গানে শক্তিশালী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার এবং গভীর লিরিক্সের মিশ্রণ দেখা যায়।

প্রশ্ন: আর্থহীন ব্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু গান কী কী?

উত্তর: আর্থহীন ব্যান্ডের জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মাঝে মাঝে’, ‘চায় না’, ‘আমার পৃথিবী’, ‘গন্তব্য’, ‘এ কেমন বিদায়’, ‘অসমাপ্ত’ এবং ‘নিঃশব্দের গান’।

প্রশ্ন: বেজবাবা সুমন কেন এত জনপ্রিয়?

উত্তর: বেজবাবা সুমন তার ব্যতিক্রমী বেজ বাজানোর শৈলী, শক্তিশালী ভোকাল এবং আকর্ষণীয় লিরিক্সের জন্য জনপ্রিয়। তিনি বেজ গিটারকে প্রধান সুরের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বাংলা সঙ্গীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

প্রশ্ন: আর্থহীন ব্যান্ডের সর্বশেষ অ্যালবাম কোনটি?

উত্তর: আর্থহীন ব্যান্ডের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম হলো ‘ধ্রুবক’, যা ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর তারা কিছু সিঙ্গেল এবং মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করেছে।

প্রশ্ন: আর্থহীন কি এখনও সক্রিয় রয়েছে?

উত্তর: হ্যাঁ, আর্থহীন ব্যান্ড এখনও সক্রিয় রয়েছে। সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমনের অসুস্থতার পর বিরতি নিলেও, তারা ফিরে এসেছে এবং নতুন গান ও কনসার্টের মাধ্যমে ভক্তদের মনোরঞ্জন করে চলেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Bottom Ad [Post Page]