Full width home advertisement

Featured Actors

Popular Biographies

Post Page Advertisement [Top]

বিবরণ তথ্য
পূর্ণ নাম আব্দুল জব্বার
জন্ম ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮
জন্মস্থান ডুমরা গ্রাম, কুষ্টিয়া জেলা, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু ৩০ আগস্ট ২০১৭ (বয়স ৭৯)
জাতীয়তা বাংলাদেশী
পেশা কণ্ঠশিল্পী, সুরকার
পরিচিতি কিংবদন্তি দেশাত্মবোধক গানের শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধা
উল্লেখযোগ্য গান 'সালাম সালাম হাজার সালাম', 'তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়', 'ও রে নীল দরিয়া', 'পিচ ঢালা পথ'
পুরস্কার একুশে পদক (১৯৮০), স্বাধীনতা পদক (১৯৯৬)

পরিচিতি

আব্দুল জব্বার, বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি তার কালজয়ী কণ্ঠ দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার গানগুলো মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। তিনি কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একজন শব্দসৈনিক, যিনি তার গানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন এবং দেশের আপামর জনসাধারণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছেন। দেশাত্মবোধক গানের এক অবিস্মরণীয় শিল্পী হিসেবে আব্দুল জব্বার চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার গানগুলো আজও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

Abdul Jabbar

Photo: Wikimedia Commons
View Source

প্রারম্ভিক জীবন

১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়া জেলার ডুমরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল জব্বার। তার পুরো নাম আব্দুল জব্বার হলেও শিল্পী হিসেবে তিনি এই নামেই পরিচিতি লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা ও সহজাত প্রতিভা। পারিবারিক পরিবেশে সঙ্গীতের চর্চা না থাকলেও, স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে তিনি সবার নজর কাড়তেন। তার বাবা ক্বারী মো. আব্দুল লতিফ এবং মা আছিয়া খাতুন। শৈশবেই তিনি তার মায়ের কাছে সঙ্গীতের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন, যিনি নিজে গান গাইতে না পারলেও সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। আব্দুল জব্বারের এই প্রাথমিক জীবনই তাকে ভবিষ্যতের একজন মহান শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠার পথ করে দিয়েছিল।

শিক্ষাজীবন

আব্দুল জব্বারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় বিদ্যালয়ে। তিনি কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি সঙ্গীতের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল প্রবল। তিনি বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন। কলকাতায় তিনি ওস্তাদ ফজলুর রহমান এবং ওস্তাদ শুকুর আলীর কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই প্রথাগত শিক্ষা তার সঙ্গীত জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে এবং তাকে বিভিন্ন ধারার গান গাওয়ার দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। তার শিক্ষাজীবন কেবল পুঁথিগত বিদ্যার্জনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সঙ্গীতের গভীরে প্রবেশ করার এক নিরন্তর সাধনাও ছিল।

ক্যারিয়ার

আব্দুল জব্বারের সঙ্গীত জীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে বেতারে গান গাওয়ার মাধ্যমে। ১৯৬০ সালে তিনি প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন, ইবনে মিজান পরিচালিত 'এ দেশ তোমার আমার' ছবিতে। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ষাটের দশকে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একজন অপরিহার্য কণ্ঠশিল্পী হয়ে ওঠেন। তার গাওয়া অসংখ্য গান জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার মধ্যে 'তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়', 'পিচ ঢালা পথ', 'ও রে নীল দরিয়া', 'বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তবে আব্দুল জব্বারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সে সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন সক্রিয় শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। তার কালজয়ী গান 'সালাম সালাম হাজার সালাম', 'জয় বাংলা বাংলার জয়', 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে' এবং 'তুমি কি দেখেছ কভু' মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস জুগিয়েছে এবং রণাঙ্গনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তিনি কলকাতার বিভিন্ন ক্যাম্পে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। এমনকি নিজের গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রি করেও তিনি সেই অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দান করেন। তার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রতীক, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

স্বাধীনতার পরেও আব্দুল জব্বার তার সঙ্গীত জীবন অব্যাহত রাখেন। তিনি আধুনিক গান, লোকসংগীত এবং দেশাত্মবোধক গান - সব ধরনের গানেই পারদর্শী ছিলেন। তার কণ্ঠের মাধুর্য এবং গানের প্রতি তার গভীর আবেগ শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। তিনি কেবল গায়কই ছিলেন না, একজন সুরকার হিসেবেও তার অবদান অনস্বীকার্য। তার সঙ্গীত বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতি ও আধুনিক সঙ্গীতের মেলবন্ধনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

উল্লেখযোগ্য অর্জন

  • মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। তার গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যুগিয়েছে এবং জনমত গঠনে সহায়তা করেছে।
  • একুশে পদক: সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৮০ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'একুশে পদক' প্রদান করে।
  • স্বাধীনতা পদক: ১৯৯৬ সালে তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'স্বাধীনতা পদক' ভূষিত করা হয়, যা তার দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।
  • বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক: তিনি বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকও লাভ করেন, যা তার দেশপ্রেম ও শিল্পকর্মের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।
  • অসংখ্য জনপ্রিয় গান: তিনি বাংলা সঙ্গীতকে উপহার দিয়েছেন 'সালাম সালাম হাজার সালাম', 'তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়', 'পিচ ঢালা পথ', 'ও রে নীল দরিয়া', 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে', 'জয় বাংলা বাংলার জয়' সহ অসংখ্য কালজয়ী গান।
  • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: তার গান শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে, যা বাংলা সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।

ব্যক্তিগত জীবন

আব্দুল জব্বার তার ব্যক্তিগত জীবনে খুব সাদামাটা ও নিরহংকার মানুষ ছিলেন। তিনি দুইবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন শাহীন জব্বার এবং দ্বিতীয় স্ত্রী প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রুহি আমিন। তিনি তিন পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল সঙ্গীতময়, যেখানে পরিবারকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। শিল্পীর খ্যাতি তাকে সাধারণ মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি; বরং তিনি সবসময়ই সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করতেন। তার বিনয়ী স্বভাব এবং সহজ-সরল জীবনযাপন তাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

মজার তথ্য

  • ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আব্দুল জব্বার নিজের গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ প্রায় ১২ হাজার টাকা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন।
  • তিনি মুম্বাইয়ে প্রখ্যাত ভারতীয় শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে 'সালাম সালাম হাজার সালাম' ও 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে' গান দুটির হিন্দি ও উর্দু সংস্করণ রেকর্ড করানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, যা ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
  • আব্দুল জব্বার প্রথমদিকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নিলেও পরবর্তীতে আধুনিক গান এবং দেশাত্মবোধক গানেই বেশি পরিচিতি লাভ করেন।
  • তার কণ্ঠে 'ও রে নীল দরিয়া' গানটি এতটাই জনপ্রিয় যে, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • তিনি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।

উপসংহার

আব্দুল জব্বার শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের এক জীবন্ত কিংবদন্তি, যিনি তার সুর ও কণ্ঠের জাদুতে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে গেছেন। বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান তাকে অমরত্ব দান করেছে। তার গানগুলো আজও আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে আছে, যা আমাদের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণার উৎস। আব্দুল জব্বার শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও, তার কালজয়ী গানগুলো তাকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে। তার সঙ্গীত বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: আব্দুল জব্বার কে ছিলেন?

উত্তর: আব্দুল জব্বার ছিলেন বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার। তিনি বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার দেশাত্মবোধক গান গেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন এবং দেশের আপামর জনসাধারণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

প্রশ্ন: আব্দুল জব্বারের উল্লেখযোগ্য কিছু গান কী কী?

উত্তর: আব্দুল জব্বারের উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে 'সালাম সালাম হাজার সালাম', 'তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়', 'ও রে নীল দরিয়া', 'পিচ ঢালা পথ', 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে' এবং 'জয় বাংলা বাংলার জয়'। এই গানগুলো আজও সমান জনপ্রিয়।

প্রশ্ন: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আব্দুল জব্বারের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আব্দুল জব্বার একজন সক্রিয় শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি তার দেশাত্মবোধক গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিলেন এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি গান গেয়ে তহবিল সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে দান করেন।

প্রশ্ন: আব্দুল জব্বার কী কী পুরস্কার পেয়েছেন?

উত্তর: সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য আব্দুল জব্বার বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'একুশে পদক' (১৯৮০) এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'স্বাধীনতা পদক' (১৯৯৬) লাভ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকও পেয়েছেন।

প্রশ্ন: আব্দুল জব্বার কবে মারা যান?

উত্তর: বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হৃদরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

প্রশ্ন: আব্দুল জব্বারের সঙ্গীত জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর: আব্দুল জব্বারের সঙ্গীত জীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে বেতারে গান গাওয়ার মাধ্যমে এবং ১৯৬০ সালে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। তিনি আধুনিক গান, লোকসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তার কণ্ঠের মাধুর্য ও দেশপ্রেমের গভীরতা তাকে বাংলা সঙ্গীতের এক অবিস্মরণীয় শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Bottom Ad [Post Page]