| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| নাম | কিয়ানু চার্লস রিভস |
| পেশা | অভিনেতা, প্রযোজক, সংগীতশিল্পী |
| জাতীয়তা | কানাডীয় |
| জন্ম | ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪ (বয়স: ৫৯ বছর) |
| জন্মস্থান | বৈরুত, লেবানন |
| পরিচিতি | 'দ্য ম্যাট্রিক্স' ও 'জন উইক' ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত হলিউড অ্যাকশন তারকা। |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | দ্য ম্যাট্রিক্স সিরিজ, জন উইক সিরিজ, স্পিড, পয়েন্ট ব্রেক, বিল অ্যান্ড টেড'স এক্সেলেন্ট অ্যাডভেঞ্চার |
পরিচিতি
হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় এবং রহস্যময় তারকাদের মধ্যে কিয়ানু রিভস একটি উজ্জ্বল নাম। তার নামের অর্থ হাওয়াইয়ান ভাষায় 'পাহাড়ের উপর শীতল বাতাস'। তিনি কেবল একজন অ্যাকশন হিরো নন, বরং একজন বহুমুখী অভিনেতা, প্রযোজক এবং একজন বিনয়ী ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। 'দ্য ম্যাট্রিক্স' ফ্র্যাঞ্চাইজির 'নিও' এবং 'জন উইক' সিরিজের নাম ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তার দীর্ঘ চার দশকের কর্মজীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন এবং ২১ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
কিয়ানু চার্লস রিভস ১৯৬৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর লেবাননের বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা প্যাট্রিসিয়া টেলর ছিলেন একজন পোশাক ডিজাইনার এবং বাবা স্যামুয়েল নাওলিন রিভস ছিলেন একজন ভূতত্ত্ববিদ। কিয়ানুর বাবা চীনা-হাওয়াইয়ান বংশোদ্ভূত এবং মা ইংরেজ। এই মিশ্র জাতিগত পরিচয় তার চেহারায় এক বিশেষ সৌন্দর্য এনে দিয়েছে।
কিয়ানুর শৈশব খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে যখন তার বয়স মাত্র তিন বছর। এরপর তিনি মা এবং ছোট বোন কিমকে নিয়ে সিডনি, নিউ ইয়র্ক এবং অবশেষে টরন্টো, কানাডায় স্থানান্তরিত হন। টরন্টোতেই তার বেড়ে ওঠা। বাবার অনুপস্থিতি এবং মায়ের ঘন ঘন বিবাহ তার জীবনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। কিয়ানু ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন, যার কারণে তার শিক্ষাজীবনে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
শিক্ষাজীবন
কিয়ানু রিভস টরন্টোর বিভিন্ন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, যার মধ্যে এটোবিকোক স্কুল অফ দ্য আর্টস অন্যতম। তবে ডিসলেক্সিয়ার কারণে তার পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন ছিল। তিনি পড়ালেখার চেয়ে খেলাধুলায় বেশি আগ্রহী ছিলেন, বিশেষ করে আইস হকি। তিনি একজন চমৎকার গোলরক্ষক ছিলেন এবং 'দ্য ওয়াল' নামে পরিচিত ছিলেন। একসময় তিনি পেশাদার হকি খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তবে, ১৬ বছর বয়সে তিনি অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শেষ পর্যন্ত হাই স্কুল ছেড়ে অভিনয় জগতে পা রাখেন।
ক্যারিয়ার
কিয়ানু রিভসের অভিনয় জীবন শুরু হয় কানাডার থিয়েটার এবং টেলিভিশন প্রযোজনা দিয়ে। ১৯৮৬ সালে 'রিভার্স এজ' চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি হলিউডে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালের কমেডি ফিল্ম 'বিল অ্যান্ড টেড'স এক্সেলেন্ট অ্যাডভেঞ্চার' তাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
নব্বইয়ের দশকে কিয়ানু নিজেকে একজন অ্যাকশন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৯১ সালের 'পয়েন্ট ব্রেক' এবং ১৯৯৪ সালের ব্লকবাস্টার 'স্পিড' তাকে অ্যাকশন ঘরানার শীর্ষ অভিনেতাদের কাতারে নিয়ে আসে। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৯ সালে, যখন তিনি 'দ্য ম্যাট্রিক্স' চলচ্চিত্রে 'নিও' চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রটি কেবল একটি ব্লকবাস্টারই ছিল না, এটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল এবং কিয়ানুকে বিশ্বব্যাপী আইকনে পরিণত করেছিল। 'দ্য ম্যাট্রিক্স' সিরিজের অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোও ব্যাপক সাফল্য লাভ করে।
ম্যাট্রিক্সের সাফল্যের পর তিনি 'কন্সট্যান্টাইন', 'দ্য লেক হাউস' এবং 'এ ওয়াক ইন দ্য ক্লাউডস' এর মতো বিভিন্ন ঘরানার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তবে, তার ক্যারিয়ারে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে ২০১৪ সালের 'জন উইক' চলচ্চিত্রটি। এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিয়ানুকে একজন অ্যাকশন সুপারস্টার হিসেবে ফিরিয়ে আনে এবং তার মার্শাল আর্ট ও স্টান্টের প্রতি নিবেদনকে নতুনভাবে তুলে ধরে। জন উইক সিরিজের প্রতিটি চলচ্চিত্রই সমালোচকদের প্রশংসা এবং বক্স অফিস সাফল্য অর্জন করেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি, কিয়ানু 'ডগস্টার' নামের একটি ব্যান্ডের বেজিস্ট হিসেবে সংগীত জগতেও যুক্ত ছিলেন এবং 'ম্যান অফ তাই চি' চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- অ্যাকশন আইকন: 'দ্য ম্যাট্রিক্স' এবং 'জন উইক' সিরিজের মাধ্যমে তিনি অ্যাকশন ঘরানার চলচ্চিত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন এবং নিজেকে একজন কিংবদন্তী অ্যাকশন হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার চলচ্চিত্রে প্রায়শই তিনি নিজের স্টান্ট নিজেই করেন, যা তাকে অনন্য করে তোলে।
- সমালোচকদের প্রশংসা: ২০২০ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাকে ২১ শতকের চতুর্থ সেরা অভিনেতা হিসেবে স্থান দেয় এবং ২০২২ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
- বক্স অফিস সাফল্য: তার অভিনীত অসংখ্য চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা তাকে হলিউডের অন্যতম সফল অভিনেতাতে পরিণত করেছে।
- মানবতাবাদী কাজ: কিয়ানু তার নিঃস্বার্থ মানবতাবাদী কাজের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি নীরবে শিশুদের হাসপাতাল এবং ক্যান্সার গবেষণার জন্য একটি ব্যক্তিগত ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং প্রচুর অর্থ দান করেছেন। তার উদারতা এবং বিনয় প্রায়শই গণমাধ্যমে উঠে আসে।
ব্যক্তিগত জীবন
কিয়ানু রিভসের ব্যক্তিগত জীবন বেশ কিছু দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী। ১৯৯৯ সালে তার বান্ধবী জেনিফার সাইম তাদের মৃত সন্তান প্রসব করেন, যার নাম রাখা হয়েছিল আভা আর্চার সাইম-রিভস। এই ঘটনার দুই বছর পর, ২০০১ সালে জেনিফার সাইম একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো কিয়ানুর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শোকাহত ছিলেন।
এই ট্র্যাজেডিগুলোর পর কিয়ানু তার ব্যক্তিগত জীবনকে অত্যন্ত গোপনীয় রাখতে পছন্দ করেন। তিনি খুব কমই তার সম্পর্ক নিয়ে জনসম্মুখে কথা বলেন। তবে, ২০১৯ সাল থেকে তিনি শিল্পী আলেকজান্দ্রা গ্রান্টের সাথে সম্পর্ক রয়েছেন, যা গণমাধ্যমে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। কিয়ানু তার বিনয়, সরলতা এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত। তিনি প্রায়শই সাধারণ জীবনযাপন করেন এবং তার বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রতি খুব বেশি আগ্রহ নেই।
মজার তথ্য
- 'স্যাড কিয়ানু' মেম: ২০০৯ সালে একটি ছবি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়, যেখানে কিয়ানুকে একটি বেঞ্চে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখা যায়। এটি 'স্যাড কিয়ানু' মেম নামে পরিচিত এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
- উদারতা: শোনা যায়, 'দ্য ম্যাট্রিক্স' চলচ্চিত্রের লাভের একটি বড় অংশ (প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার) তিনি চলচ্চিত্রের স্পেশাল ইফেক্টস এবং কস্টিউম টিমের সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন।
- বিনয়ী জীবনযাপন: এত বড় তারকা হওয়া সত্ত্বেও কিয়ানু রিভস বিলাসবহুল জীবনযাপন পছন্দ করেন না। তার কোনো ব্যক্তিগত বিশাল ম্যানশন নেই এবং তিনি প্রায়শই সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন।
- মোটরসাইকেল প্রেমী: কিয়ানু একজন প্রচণ্ড মোটরসাইকেল প্রেমী এবং তার নিজস্ব একটি মোটরসাইকেল কোম্পানিও রয়েছে, যার নাম 'আর্ক মোটরসাইকেল'।
- মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ: 'দ্য ম্যাট্রিক্স' এবং 'জন উইক' সিরিজের জন্য তিনি কঠোর মার্শাল আর্ট এবং জুডো প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যা তাকে পর্দায় বাস্তবসম্মত অ্যাকশন পরিবেশনে সহায়তা করেছে।
উপসংহার
কিয়ানু রিভস কেবল একজন সফল অভিনেতা নন, তিনি একজন সংস্কৃতি আইকন যিনি তার কাজ এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধ উভয় দিয়েই বিশ্বকে প্রভাবিত করেছেন। তার ক্যারিয়ারে উত্থান-পতন থাকলেও, তিনি সবসময় তার শিল্প এবং দর্শকদের প্রতি নিবেদিত ছিলেন। 'দ্য ম্যাট্রিক্স' এর নিও থেকে 'জন উইক' এর জন পর্যন্ত, কিয়ানু রিভস প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল একজন অ্যাকশন হিরো নন, বরং একজন গভীর এবং সংবেদনশীল শিল্পী। তার বিনয়, উদারতা এবং জীবনের প্রতি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে হলিউডের অন্যান্য তারকাদের থেকে আলাদা করেছে এবং তাকে বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তদের কাছে প্রিয় করে তুলেছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভস কে?
উত্তর: কিয়ানু রিভস হলেন একজন জনপ্রিয় কানাডীয় অভিনেতা, প্রযোজক এবং সংগীতশিল্পী। তিনি তার অ্যাকশন-প্যাকড চলচ্চিত্র যেমন 'দ্য ম্যাট্রিক্স' এবং 'জন উইক' সিরিজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তার বিনয়ী আচরণ এবং মানবতাবাদী কাজের জন্যও তিনি প্রশংসিত।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভস কোন চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত?
উত্তর: কিয়ানু রিভস মূলত 'দ্য ম্যাট্রিক্স' ফ্র্যাঞ্চাইজিতে 'নিও' চরিত্রে এবং 'জন উইক' ফ্র্যাঞ্চাইজিতে নাম ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এছাড়া 'স্পিড' এবং 'পয়েন্ট ব্রেক' এর মতো চলচ্চিত্রও তার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভসের ব্যক্তিগত জীবনে কি কোনো দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে?
উত্তর: হ্যাঁ, কিয়ানু রিভসের ব্যক্তিগত জীবন বেশ কিছু ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে। ১৯৯৯ সালে তার বান্ধবী জেনিফার সাইম তাদের মৃত সন্তান প্রসব করেন এবং ২০০১ সালে জেনিফার নিজেও একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। এই ঘটনাগুলো তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভস কি মানবতাবাদী কাজের সাথে জড়িত?
উত্তর: হ্যাঁ, কিয়ানু রিভস তার মানবতাবাদী কাজের জন্য সুপরিচিত। তিনি গোপনে ক্যান্সার গবেষণার জন্য একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং শিশুদের হাসপাতাল ও অন্যান্য দাতব্য সংস্থায় প্রচুর অর্থ দান করেছেন। তার উদারতা এবং সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতি প্রায়শই গণমাধ্যমে উঠে আসে।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভসের জাতীয়তা কী?
উত্তর: কিয়ানু রিভসের জাতীয়তা কানাডীয়। যদিও তার জন্ম বৈরুত, লেবাননে, তিনি বেড়ে উঠেছেন টরন্টো, কানাডায় এবং কানাডীয় নাগরিকত্ব ধারণ করেন।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভসের বর্তমান বয়স কত?
উত্তর: কিয়ানু রিভসের জন্ম ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪ সালে। ২০২৩ সালের হিসাবে তার বয়স ৫৯ বছর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ৬০ বছরে পা দেবেন।
প্রশ্ন: কিয়ানু রিভস কি শুধু অ্যাকশন ফিল্মেই অভিনয় করেন?
উত্তর: না, কিয়ানু রিভস শুধুমাত্র অ্যাকশন ফিল্মেই অভিনয় করেন না। যদিও তিনি অ্যাকশন ঘরানার জন্য বেশি পরিচিত, তিনি রোমান্টিক কমেডি, ড্রামা এবং থ্রিলার সহ বিভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি একজন বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে পরিচিত।
No comments:
Post a Comment