তথ্যসারণি
| পূর্ণ নাম | অমিতাভ হরিবংশ রায় বচ্চন |
|---|---|
| জন্ম | ১১ অক্টোবর ১৯৪২ |
| জন্মস্থান | এলাহাবাদ, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে প্রয়াগরাজ, উত্তরপ্রদেশ, ভারত) |
| পেশা | অভিনেতা, প্রযোজক, গায়ক, টেলিভিশন উপস্থাপক |
| জাতীয়তা | ভারতীয় |
| স্ত্রী | জয়া বচ্চন |
| সন্তান | শ্বেতা বচ্চন নন্দা, অভিষেক বচ্চন |
| বাবা-মা | হরিবংশ রায় বচ্চন (বাবা), তেজি বচ্চন (মা) |
| পরিচিতি | বলিউডের 'শাহেনশাহ', 'বিগ বি', 'শতাব্দীর মহানায়ক' |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | ৭টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৭টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্ম বিভূষণ, পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী |
পরিচিতি
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি, যিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, বরং একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি অমিতাভ বচ্চন, যিনি 'বিগ বি', 'শতাব্দীর মহানায়ক' এবং 'বলিউডের শাহেনশাহ' নামে পরিচিত। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা, গভীর কণ্ঠস্বর এবং অনন্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে তার প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে ফরাসি পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ট্রুফো তাকে 'ওয়ান-ম্যান ইন্ডাস্ট্রি' বা 'একক ব্যক্তি শিল্প' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নিজেকে এক কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেখানে তার প্রতিটি চরিত্রই যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে দর্শকের মনে।

Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
অমিতাভ বচ্চন ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের এলাহাবাদে (বর্তমান প্রয়াগরাজ, উত্তরপ্রদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হরিবংশ রায় বচ্চন ছিলেন একজন প্রখ্যাত হিন্দি কবি এবং মা তেজি বচ্চন ছিলেন একজন সমাজকর্মী। অমিতাভের পারিবারিক নাম ছিল শ্রীবাস্তব, কিন্তু তার বাবা 'বচ্চন' ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তীতে অমিতাভ তার পেশাগত পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তার ছোট ভাইয়ের নাম অজিতাভ বচ্চন। শৈশব থেকেই অমিতাভ শিল্প ও সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যা তার মধ্যে শিল্পানুরাগের বীজ বপন করে। তার বাবা প্রথমে তার নাম 'ইনকিলাব' রাখতে চেয়েছিলেন, যা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক ছিল, কিন্তু কবি সুমিত্রানন্দন পান্তের পরামর্শে তার নাম রাখা হয় অমিতাভ, যার অর্থ 'অনন্ত জ্যোতি'।
শিক্ষাজীবন
অমিতাভ বচ্চনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় এলাহাবাদের জ্ঞান প্রবোধিনী এবং বয়েজ হাই স্কুলে। এরপর তিনি নৈনিতালের শেরউড কলেজে পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি তার অভিনয় এবং মঞ্চে পারফরম্যান্সের প্রতি আগ্রহের প্রথম প্রকাশ ঘটান। পরবর্তীকালে তিনি দিল্লির কিরোড়ি মাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবন তাকে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানই দেয়নি, বরং তার ব্যক্তিত্ব গঠন এবং ভবিষ্যতের অভিনয় জীবনের ভিত্তি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্যারিয়ার
অমিতাভ বচ্চনের অভিনয় জীবন শুরু হয় ১৯৬৯ সালে সাত হিন্দুস্তানি ছবির মাধ্যমে, যেখানে তিনি একজন ভয়েস ন্যারেটর হিসেবে কাজ করেন। প্রথম দিকে তাকে তার উচ্চতা এবং গভীর কণ্ঠস্বরের জন্য অনেকবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। তবে, ১৯৭৩ সালে প্রকাশ মেহরা পরিচালিত জাঞ্জির ছবিটি তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই ছবিতে তিনি 'অ্যাংরি ইয়াং ম্যান' চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন এবং ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন ধারার সূচনা করেন।
পরবর্তী দশকে তিনি একের পর এক হিট ছবি উপহার দেন, যার মধ্যে দিওয়ার, শোলে, ডন, মুকাদ্দার কা সিকান্দার, অমর আকবর অ্যান্টনি, ত্রিশূল, কালা পাথ্থর এবং সিলসিলা উল্লেখযোগ্য। এই সময়কালে তিনি ভারতীয় বক্স অফিসের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন। ১৯৮২ সালে কুলি ছবির সেটে এক মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিলেন, যা পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর তার ক্যারিয়ারে কিছুটা মন্দা আসে, কিন্তু ২০০০ সালে টেলিভিশন কুইজ শো কউন বনেগা ক্রোড়পতি (KBC) এর উপস্থাপক হিসেবে তার পুনরাগমন ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা তাকে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে।
KBC-এর সাফল্যের পর তিনি আবার চলচ্চিত্রে সক্রিয় হন এবং মোহাব্বাতেঁ, ব্ল্যাক, পা, পিকু এবং পিঙ্ক-এর মতো সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, একজন সফল প্লেব্যাক গায়ক এবং প্রযোজক হিসেবেও তার কর্মজীবনের বৈচিত্র্য প্রমাণ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- পুরস্কার ও সম্মাননা: অমিতাভ বচ্চন তার অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৭টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ৪টি), ১৭টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে ৫টি) এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
- নাগরিক সম্মান: ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী (১৯৮৪), পদ্মভূষণ (২০০১) এবং পদ্ম বিভূষণ (২০১৫) দ্বারা ভূষিত করেছে, যা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারগুলির মধ্যে অন্যতম।
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'নাইট অফ দ্য লিজিয়ন অফ অনার' প্রদান করে।
- একক ব্যক্তি শিল্প: ফরাসি পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ট্রুফো তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের 'একক ব্যক্তি শিল্প' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা তার ব্যাপক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
- টেলিভিশন বিপ্লব: কউন বনেগা ক্রোড়পতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় টেলিভিশনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন এবং এর উপস্থাপক হিসেবে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
অমিতাভ বচ্চন ১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত অভিনেত্রী জয়া ভাদুড়িকে (বর্তমানে জয়া বচ্চন) বিবাহ করেন। তাদের দুই সন্তান – মেয়ে শ্বেতা বচ্চন নন্দা এবং ছেলে অভিষেক বচ্চন, যিনি নিজেও একজন সফল অভিনেতা। অমিতাভ ও জয়ার দাম্পত্য জীবন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম স্থিতিশীল ও প্রশংসিত সম্পর্ক। তাদের পরিবারে নাতি-নাতনিরাও রয়েছে, যার মধ্যে নভ্যা নভেলি নন্দা, অগস্ত্য নন্দা এবং আরাধ্যা বচ্চন উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৪ সালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং এলাহাবাদ লোকসভা আসন থেকে নির্বাচিত হন, কিন্তু তিন বছর পর তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসেন। তার ব্যক্তিগত জীবন সবসময়ই জনসমক্ষে ছিল, তবে তিনি তা অত্যন্ত মর্যাদা ও পেশাদারিত্বের সাথে পরিচালনা করেছেন।
মজার তথ্য
- অভিনয় জীবনে আসার আগে অমিতাভ বচ্চন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একজন ঘোষক হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের জন্য তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। ironic, considering his voice became his trademark.
- তার বিখ্যাত ছবি কুলি-এর সেটে একটি দুর্ঘটনার পর তিনি প্রায় আট মিনিট ক্লিনিক্যালি ডেড ছিলেন।
- শৈশবে তার বাবা হরিবংশ রায় বচ্চন তার নাম 'ইনকিলাব' রাখতে চেয়েছিলেন, যা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ব্যবহৃত একটি স্লোগান।
- অমিতাভ বচ্চন একজন নিরামিষাশী।
- তিনি প্রথম ভারতীয় অভিনেতা যিনি লন্ডনের মাদাম তুসো জাদুঘরে মোমের মূর্তি পেয়েছেন।
উপসংহার
অমিতাভ বচ্চন শুধুমাত্র একজন অভিনেতা নন, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার ক্যারিয়ার উত্থান-পতন, সাফল্য ও চ্যালেঞ্জে ভরপুর ছিল, কিন্তু প্রতিটি ধাপেই তিনি নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করেছেন। তার অভিনয় দক্ষতা, তার কণ্ঠস্বর, তার ব্যক্তিত্ব এবং তার দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা তাকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক চিরন্তন আইকনে পরিণত করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তিনি দর্শকদের বিনোদন দিয়ে যাচ্ছেন এবং তার উত্তরাধিকার ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অমিতাভ বচ্চন নামটা কেবল একজন অভিনেতার নয়, বরং দৃঢ়তা, প্রতিভা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক প্রতীক।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চন কে?
উত্তর: অমিতাভ বচ্চন একজন ভারতীয় কিংবদন্তি অভিনেতা, প্রযোজক, গায়ক এবং টেলিভিশন উপস্থাপক। তিনি বলিউডের 'শাহেনশাহ' এবং 'বিগ বি' নামে পরিচিত এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চনের জন্ম কবে এবং কোথায়?
উত্তর: অমিতাভ বচ্চন ১৯৪২ সালের ১১ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের এলাহাবাদে (বর্তমানে প্রয়াগরাজ, উত্তরপ্রদেশ, ভারত) জন্মগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চনের স্ত্রীর নাম কী?
উত্তর: অমিতাভ বচ্চনের স্ত্রীর নাম জয়া বচ্চন, যিনি নিজেও একজন প্রখ্যাত অভিনেত্রী এবং রাজনীতিবিদ। তাদের ১৯৭৩ সালে বিবাহ হয়।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চন কী কী পুরস্কার পেয়েছেন?
উত্তর: তিনি ৭টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৭টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও, ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং পদ্ম বিভূষণ দ্বারা সম্মানিত করেছে।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চনকে কেন 'বিগ বি' বলা হয়?
উত্তর: 'বিগ বি' হলো অমিতাভ বচ্চনের একটি জনপ্রিয় ডাকনাম, যা তার লম্বা গড়ন (Big) এবং নামের প্রথম অক্ষর (B) থেকে এসেছে। এটি তার বিশাল ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে তার প্রভাবশালী অবস্থানের প্রতীক।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চনের প্রথম চলচ্চিত্র কোনটি?
উত্তর: অমিতাভ বচ্চনের প্রথম চলচ্চিত্র হলো ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাত হিন্দুস্তানি। যদিও এটি বক্স অফিসে খুব বেশি সফল ছিল না, এটি তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনের সূচনা করে।
প্রশ্ন: অমিতাভ বচ্চন কি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন?
উত্তর: হ্যাঁ, অমিতাভ বচ্চন ১৯৮৪ সালে স্বল্প সময়ের জন্য রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং এলাহাবাদ আসন থেকে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তবে, তিন বছর পর তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসেন এবং অভিনয়ে মনোনিবেশ করেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন