| তথ্যসারণি | |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | জিয়াউর রহমান |
| জন্ম | ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ |
| জন্মস্থান | বগুড়া, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ) |
| মৃত্যু | ৩০ মে ১৯৮১ (বয়স ৪৫) |
| মৃত্যুস্থান | চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশী |
| পেশা | সামরিক কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ |
| পরিচিতি | বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা, বীর উত্তম |
| রাজনৈতিক দল | বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) |
| দাম্পত্য সঙ্গী | খালেদা জিয়া |
| সন্তান | তারেক রহমান, আরাফাত রহমান |
পরিচিতি
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালের অন্যতম প্রধান স্থপতি। তিনি একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান, বিশেষ করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ, তাঁকে বাঙালি জাতির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সুসংহত করার মাধ্যমে দেশকে নতুন পথে পরিচালিত করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর প্রতিষ্ঠাতা এবং দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে। তাঁর পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন রসায়নবিদ এবং মাতা জাহানারা খাতুন একজন গৃহিণী। বাবার চাকরির সুবাদে জিয়াউর রহমানের শৈশবের অনেকটা সময় কাটে কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে। তিনি ছিলেন পাঁচ ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। শৈশবেই তিনি শৃঙ্খলা, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের মূল্যবোধে দীক্ষিত হন, যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধের প্রতি অনুপ্রাণিত করেছিল।
শিক্ষাজীবন
জিয়াউর রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় বগুড়ায়। এরপর তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন, যেখানে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর তাঁর পিতা করাচিতে স্থানান্তরিত হলে তিনি করাচি একাডেমী স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে সাফল্যের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর তিনি করাচির ডি.জে. সিন্ধু কলেজে ভর্তি হন। তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল সামরিক জীবন। ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুলস্থ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন, যা তাঁর জীবনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি দ্রুত নিজেকে একজন দক্ষ ও চৌকস ক্যাডেট হিসেবে প্রমাণ করেন, যা তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলীকে আরও শাণিত করে তোলে।
ক্যারিয়ার
সামরিক জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদানের পর ১৯৫৫ সালে তিনি কমিশন লাভ করেন এবং একজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি প্রথমে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যুক্ত হন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি খেমকারান সেক্টরে একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অসামান্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন এবং সাহসিকতার জন্য পুরস্কৃত হন। এই যুদ্ধ তাঁর সামরিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের প্রখরতা প্রমাণ করে। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন সামরিক পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে গণহত্যা শুরু করে, তখন জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ২৭ মার্চ (মতান্তরে ২৬ মার্চ) চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘোষণা মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অসীম সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগায়। পরবর্তীতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে এবং পরে জেড ফোর্সের (জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণকৃত) অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'বীর উত্তম' খেতাবে ভূষিত করা হয়, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক উত্থান
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে দেশ যখন টালমাটাল, তখন ৭ নভেম্বর 'সিপাহী-জনতার বিপ্লব'-এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তিনি প্রথমে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শাসনকাল: পুনর্গঠন ও উন্নয়ন
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশের পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন। তিনি 'এক জাতি এক দেশ' স্লোগান নিয়ে জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সুসংহত করার চেষ্টা করেন।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও গ্রামীণ উন্নয়ন: জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে 'খাল কাটা কর্মসূচি' এবং 'স্বনির্ভর বাংলাদেশ' আন্দোলন শুরু করেন। এই কর্মসূচিগুলো কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটায় এবং খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সহায়ক হয়। তাঁর অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে এবং দেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনে। তিনি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে সহায়তা করেন।
রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা: তিনি বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং দেশের বিচার ব্যবস্থাকে সুসংহত করার উদ্যোগ নেন। তাঁর শাসনামলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বৈদেশিক নীতি: জিয়াউর রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী, যা আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তাঁর দূরদর্শী বৈদেশিক নীতি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে আসে।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ (মতান্তরে ২৬ মার্চ) চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করা।
- মহান মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টর ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখা।
- মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য অবদানের জন্য 'বীর উত্তম' খেতাবে ভূষিত হওয়া।
- ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের হাল ধরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
- ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা, যা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
- অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ এবং 'খাল কাটা কর্মসূচি' ও 'স্বনির্ভর বাংলাদেশ' আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটানো।
- বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা।
- দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফাস্ট লেডি বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের আত্মীয়, বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুসংহত। এই দম্পতির দুই পুত্র সন্তান—তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান (প্রয়াত)। জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং কর্মঠ। তিনি নিয়মিত ব্যায়াম করতেন এবং নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করতেন। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর মধ্যে কঠোরতা থাকলেও, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিনয়ী, বন্ধুবৎসল এবং সহজ-সরল ছিলেন। তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা দেশের রাজনীতিতে তাঁদের পরিবারের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের পরিচায়ক। তিনি সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতে পারতেন এবং তাদের সমস্যা আন্তরিকভাবে শুনতেন।
মজার তথ্য
- জিয়াউর রহমান তাঁর সামরিক জীবনের শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী এবং সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময় তিনি বেশ কিছু রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
- রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পায়ে হেঁটে পরিদর্শনে যেতেন। সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলতেন এবং তাদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করতেন। তাঁর 'খাল কাটা কর্মসূচি'র সময় তিনি নিজেও কোদাল হাতে মাটি কাটায় অংশ নিতেন, যা সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করত এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি করত।
- তাঁর প্রিয় খাবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ বাঙালি খাবার, বিশেষ করে ডাল-ভাত এবং শুঁটকি মাছ। তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন পছন্দ করতেন না এবং সব সময়ই মিতব্যয়ী ছিলেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছেদও ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
- তিনি ছিলেন একজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং অবসর সময়ে বাগান করতে ভালোবাসতেন। রাষ্ট্রপতি ভবনেও তিনি নিজের হাতে গাছ লাগাতেন এবং সেগুলোর পরিচর্যা করতেন।
- জিয়াউর রহমান একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড়ও ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি ফুটবল খেলায় বেশ পারদর্শী ছিলেন এবং সামরিক একাডেমিতেও খেলাধুলায় সক্রিয় ছিলেন।
উপসংহার
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং বহু আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল কর্মময় এবং ঘটনাবহুল। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য, যা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর শাসনামলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং একটি শক্তিশালী বৈদেশিক নীতি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। তবে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল নিয়ে তাঁর সমালোচনাও রয়েছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে, যার প্রভাব আজও বিদ্যমান। জিয়াউর রহমান তাঁর কর্ম, আদর্শ এবং বিতর্কিত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, যা নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান কে ছিলেন?
উত্তর: জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের একজন সামরিক নেতা ও রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীতে দেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর প্রতিষ্ঠাতা।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান কখন স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন?
উত্তর: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ (মতান্তরে ২৬ মার্চ) জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা মুক্তিকামী বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান কত সালে রাষ্ট্রপতি হন?
উত্তর: ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং দেশের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেন।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান কোন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন?
উত্তর: জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল এবং দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান কিভাবে মারা যান?
উত্তর: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমানের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দুটি অর্জন কী?
উত্তর: তাঁর শাসনামলের দুটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো অর্থনৈতিক উদারীকরণ নীতি গ্রহণ এবং 'খাল কাটা কর্মসূচি'র মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এছাড়াও তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং সার্ক গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
প্রশ্ন: জিয়াউর রহমানকে কেন 'বীর উত্তম' খেতাব দেওয়া হয়েছিল?
উত্তর: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বপূর্ণ অবদান, বিশেষ করে ১ নম্বর সেক্টর ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জিয়াউর রহমানকে 'বীর উত্তম' খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন