তথ্যসারণি
| পূর্ণ নাম | অ্যাডেল লরি ব্লু অ্যাডকিন্স |
|---|---|
| পরিচিত নাম | অ্যাডেল |
| জন্ম | ৫ মে ১৯৮৮ |
| জন্মস্থান | টটেনহ্যাম, লন্ডন, ইংল্যান্ড |
| জাতীয়তা | ব্রিটিশ |
| পেশা | গায়িকা, গীতিকার |
| সঙ্গীত ধারা | সোল, পপ, আরঅ্যান্ডবি |
| উল্লেখযোগ্য অ্যালবাম | ১৯, ২১, ২৫, ৩০ |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | ১৬টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, ১২টি ব্রিট অ্যাওয়ার্ড, ১টি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড |
পরিচিতি
অ্যাডেল লরি ব্লু অ্যাডকিন্স, যিনি বিশ্বজুড়ে কেবল অ্যাডেল নামেই পরিচিত, ব্রিটিশ সঙ্গীতের এক কিংবদন্তী শিল্পী। তার শক্তিশালী মেজো-সোপrano কণ্ঠস্বর, আবেগপূর্ণ গীতিকাব্য এবং হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন। অ্যাডেল কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি একজন নিপুণ গীতিকারও, যিনি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির গভীরতা দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন। আধুনিক পপ ও সোল সঙ্গীতের জগতে তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি তার সঙ্গীত দিয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছেন।
Photo: Wikimedia Commons
View Source
প্রারম্ভিক জীবন
১৯৮৮ সালের ৫ মে লন্ডনের টটেনহ্যামে অ্যাডেলের জন্ম। তার মা পেনি অ্যাডকিন্স এবং বাবা মার্ক ইভান্স। অ্যাডেলের যখন মাত্র দুই বছর বয়স, তখন তার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান এবং তার মা একাই তাকে বড় করে তোলেন। শৈশব থেকেই অ্যাডেল সঙ্গীতের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। তিনি স্পাইস গার্লস এবং ইটা জেমসের মতো শিল্পীদের গান শুনে বড় হয়েছেন এবং তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় তার শৈশব কেটেছে, যা তার সঙ্গীত এবং জীবনবোধে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শিক্ষাজীবন
অ্যাডেলের শিক্ষাজীবন সঙ্গীতের দিকেই মোড় নিয়েছিল। তিনি লন্ডনের বিখ্যাত ব্রিট স্কুল ফর পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড টেকনোলজি (BRIT School for Performing Arts and Technology)-তে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানেই তিনি অ্যামি ওয়াইনহাউস ও জেসি জে-এর মতো ভবিষ্যৎ তারকাদের সহপাঠী ছিলেন। ব্রিট স্কুলে পড়াশোনা করার সময় তিনি সঙ্গীত তত্ত্ব এবং প্রযোজনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন, যা তার সঙ্গীত ক্যারিয়ারের ভিত্তি স্থাপন করে। ২০০৬ সালে তিনি ব্রিট স্কুল থেকে স্নাতক হন। এই শিক্ষাই তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
ক্যারিয়ার
অ্যাডেলের সঙ্গীত ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৬ সালে, যখন তার বন্ধু মাইস্পেসে তার কিছু ডেমো আপলোড করেন। এই ডেমোগুলি XL রেকর্ডিংসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং ২০০৬ সালের নভেম্বরে তিনি তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন।
প্রাথমিক সাফল্য: অ্যালবাম ১৯
২০০৮ সালে অ্যাডেলের প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম ১৯ মুক্তি পায়। এই অ্যালবামটি সমালোচকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং বাণিজ্যিকভাবেও সাফল্য লাভ করে। 'চেইজিং পেভমেন্টস' এবং 'কোল্ড শোল্ডার' এর মতো গানগুলি তাকে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়। এই অ্যালবামের জন্য তিনি ২০০৯ সালে বেস্ট নিউ আর্টিস্ট এবং বেস্ট ফিমেল পপ ভোকাল পারফরম্যান্স ক্যাটাগরিতে দুটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
বিশ্বব্যাপী পরিচিতি: অ্যালবাম ২১
২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার দ্বিতীয় অ্যালবাম ২১ অ্যাডেলকে বিশ্বব্যাপী সুপারস্টারে পরিণত করে। 'রোলিং ইন দ্য ডিপ', 'সামওয়ান লাইক ইউ' এবং 'সেট ফায়ার টু দ্য রেইন' এর মতো গানগুলি বিশ্বজুড়ে চার্ট টপার হয়। এই অ্যালবামটি প্রায় সব রেকর্ড ভেঙে দেয় এবং সর্বকালের সেরা বিক্রিত অ্যালবামগুলির একটিতে পরিণত হয়। ২১ অ্যালবামের জন্য অ্যাডেল ২০১২ সালে ছয়টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জেতেন, যার মধ্যে অ্যালবাম অফ দ্য ইয়ার, রেকর্ড অফ দ্য ইয়ার এবং সং অফ দ্য ইয়ার অন্যতম। এটি তার ক্যারিয়ারের এক যুগান্তকারী অধ্যায় ছিল।
অ্যালবাম ২৫ ও ৩০
চার বছরের বিরতির পর ২০১৫ সালে অ্যাডেল তার তৃতীয় অ্যালবাম ২৫ নিয়ে ফিরে আসেন। 'হ্যালো' গানটি মুক্তির পরপরই বিশ্বজুড়ে ঝড় তোলে এবং অসংখ্য রেকর্ড ভেঙে দেয়। ২৫ অ্যালবামটিও বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সফল হয় এবং এটিও একাধিক গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জেতে, যার মধ্যে অ্যালবাম অফ দ্য ইয়ার এবং সং অফ দ্য ইয়ার উল্লেখযোগ্য। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ২০২১ সালে তার চতুর্থ অ্যালবাম ৩০ প্রকাশিত হয়, যা তার ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রাম ও মাতৃত্বের প্রতিচ্ছবি। এই অ্যালবামটিও সমালোচকদের প্রশংসা কুঁড়িয়েছে এবং 'ইজি অন মি' গানটি শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
অন্যান্য অর্জন
সঙ্গীত অ্যালবামের বাইরে অ্যাডেল জেমস বন্ড চলচ্চিত্র স্কাইফল-এর থিম সং গেয়েছেন, যার জন্য তিনি একটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং একটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। তার লাইভ পারফরম্যান্সগুলিও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত, যেখানে তার কণ্ঠের শক্তি এবং আবেগ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
উল্লেখযোগ্য অর্জন
- গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস: অ্যাডেল তার সঙ্গীত ক্যারিয়ারে মোট ১৬টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন, যা তাকে সর্বকালের অন্যতম সম্মানিত শিল্পীদের একজন করে তুলেছে।
- ব্রিট অ্যাওয়ার্ডস: তিনি ১২টি ব্রিট অ্যাওয়ার্ডের মালিক, যা ব্রিটিশ সঙ্গীত শিল্পে তার অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেয়।
- অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড: জেমস বন্ড চলচ্চিত্র স্কাইফল-এর থিম সং 'স্কাইফল' এর জন্য তিনি সেরা মৌলিক গান বিভাগে একটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
- গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড: 'স্কাইফল' গানের জন্য তিনি একটি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।
- সর্বোচ্চ বিক্রিত অ্যালবাম: তার অ্যালবাম '২১' এবং '২৫' সর্বকালের সেরা বিক্রিত অ্যালবামগুলির মধ্যে অন্যতম এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
- এমই অ্যাওয়ার্ড: তার টেলিভিশন স্পেশাল 'অ্যাডেল: ওয়ান নাইট অনলি' এর জন্য তিনি একটি প্রাইমটাইম এমই অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন
অ্যাডেল তার ব্যক্তিগত জীবনকে জনসমক্ষে খুব বেশি আনেন না, তবে তার সম্পর্ক এবং মাতৃত্ব তার সঙ্গীতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০১২ সালে তিনি সাইমন কোনেকি নামে একজন ব্যবসায়ীর সাথে সম্পর্কে জড়ান এবং একই বছর তাদের পুত্র অ্যাঞ্জেলো জেমস কোনেকি জন্ম নেয়। ২০১৭ সালে অ্যাডেল এবং সাইমন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, কিন্তু ২০১৯ সালে তারা আলাদা হয়ে যান এবং ২০২১ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়। অ্যাডেল তার পুত্রের প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত এবং তার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাগুলি প্রায়শই তার গানের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে তিনি স্পোর্টস এজেন্ট রিচ পলের সাথে সম্পর্কে রয়েছেন।
মজার তথ্য
- অ্যাডেলের প্রথম অ্যালবাম '১৯' তার বয়স অনুসারে নামকরণ করা হয়েছিল, যখন তিনি অ্যালবামটির গানগুলি লিখেছিলেন। একইভাবে, তার পরবর্তী অ্যালবামগুলিও তার বয়স (২১, ২৫, ৩০) অনুসারে নামকরণ করা হয়েছে, যা তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
- তিনি ব্রিট স্কুলে পড়াশোনা করার সময় অ্যামি ওয়াইনহাউস এবং জেসি জে-এর মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সহপাঠী ছিলেন।
- অ্যাডেল মঞ্চে পারফর্ম করার সময় কিছুটা নার্ভাস থাকেন এবং মাঝে মাঝে স্টেজ ভীতি অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন।
- তার প্রিয় পানীয় হলো চা, এবং তিনি প্রায়শই তার সাক্ষাত্কারে এর কথা উল্লেখ করেন।
- অ্যাডেল একজন প্রবল ধূমপায়ী ছিলেন, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের সুরক্ষার জন্য তিনি ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন।
উপসংহার
অ্যাডেল তার ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গান এবং অকৃত্রিম ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বিশ্ব সঙ্গীত জগতে নিজের এক অনন্য স্থান তৈরি করেছেন। তার সঙ্গীত কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষের আবেগ ও অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। অসংখ্য পুরস্কার এবং বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি শ্রোতার ভালোবাসা তাকে একজন সত্যিকারের সঙ্গীত আইকনে পরিণত করেছে। অ্যাডেলের সঙ্গীত যাত্রা প্রমাণ করে যে, প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং সততা দিয়ে যেকোনো বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। তিনি আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক অনুপ্রেরণা, যিনি তার গান দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করে চলেছেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: অ্যাডেলের পূর্ণ নাম কী?
উত্তর: অ্যাডেলের পূর্ণ নাম হলো অ্যাডেল লরি ব্লু অ্যাডকিন্স। তিনি বিশ্বজুড়ে 'অ্যাডেল' নামেই পরিচিত এবং এই নামেই তার সঙ্গীতকর্ম প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন: অ্যাডেল কতগুলি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন?
উত্তর: অ্যাডেল তার সঙ্গীত ক্যারিয়ারে মোট ১৬টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। তার অ্যালবাম '২১' এবং '২৫' এর জন্য তিনি একাধিক গ্র্যামি পুরস্কার লাভ করেন।
প্রশ্ন: অ্যাডেলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান কোনটি?
উত্তর: অ্যাডেলের অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে, তবে 'রোলিং ইন দ্য ডিপ', 'সামওয়ান লাইক ইউ', 'হ্যালো' এবং 'সেট ফায়ার টু দ্য রেইন' তার সবচেয়ে পরিচিত এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে অন্যতম।
প্রশ্ন: অ্যাডেলের জন্মস্থান কোথায়?
উত্তর: অ্যাডেলের জন্ম ১৯৮৮ সালের ৫ মে লন্ডনের টটেনহ্যামে। তিনি সেখানেই তার শৈশবের একটি বড় অংশ কাটিয়েছেন।
প্রশ্ন: অ্যাডেলের প্রথম অ্যালবাম কোনটি?
উত্তর: অ্যাডেলের প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম হলো '১৯', যা ২০০৮ সালে মুক্তি পায়। এই অ্যালবামটি তার বয়স অনুসারে নামকরণ করা হয়েছিল যখন তিনি এর গানগুলি লিখেছিলেন।
প্রশ্ন: অ্যাডেল কোন সঙ্গীত ধারার শিল্পী?
উত্তর: অ্যাডেল মূলত সোল, পপ এবং আরঅ্যান্ডবি (R&B) ধারার সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তার গানে এই ধারাগুলির গভীর প্রভাব দেখা যায়।
প্রশ্ন: অ্যাডেল কি বিবাহিত?
উত্তর: অ্যাডেল পূর্বে সাইমন কোনেকিকে বিয়ে করেছিলেন এবং তাদের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। বর্তমানে তারা বিবাহবিচ্ছেদ করেছেন এবং অ্যাডেল স্পোর্টস এজেন্ট রিচ পলের সাথে সম্পর্কে রয়েছেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন