Full width home advertisement

Politicians

Celebrities

Post Page Advertisement [Top]

 ড. মুহাম্মদ ইউনূস হলেন একজন বিশ্ববরেণ্য বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ, সামাজিক উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্রঋণ ধারণার অগ্রদূত, যিনি গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতিতে এই মহান ব্যক্তির অবদান অতুলনীয়, আর তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর জীবনী আমাদের সকলের জন্যই এক অসামান্য অনুপ্রেরণার উৎস। ২০০৬ সালে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।



এক নজরে

  • পুরো নাম: ড. মুহাম্মদ ইউনূস

  • জন্ম তারিখ: ২৮ জুন, ১৯৪০

  • জন্মস্থান: হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)

  • মৃত্যু তারিখ: প্রযোজ্য নয় (জীবিত)

  • জাতীয়তা: বাংলাদেশি

  • পেশা: অর্থনীতিবিদ, সামাজিক উদ্যোক্তা, অধ্যাপক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (২০২৪-বর্তমান)

  • উল্লেখযোগ্য কাজ: গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসা ধারণার প্রবর্তন


প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৪০ সালের ২৮ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার কাপ্তাই সড়কের পাশে অবস্থিত বাথুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং মাতা সুফিয়া খাতুন ছিলেন একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও দানশীল নারী। নয় ভাইবোনের মধ্যে ড. ইউনূস ছিলেন তৃতীয়। তার মায়ের পরোপকারী স্বভাব ও গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করার মানসিকতা ইউনূসের শিশুমনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, যা পরবর্তীতে তার জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। ১৯৪৪ সালে তার পরিবার শহরের কেন্দ্রস্থল চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় স্থানান্তরিত হয়।

তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম শহরের লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। এই স্কুলে অধ্যয়নকালেই তিনি বয় স্কাউটস আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। স্কাউটিংয়ের কারণে শৈশবেই তার মধ্যে নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলী ও সমাজসেবার মানসিকতা বিকশিত হতে থাকে। স্কাউট হিসেবে তিনি ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তান এবং ১৯৫৫ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান, যা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রসারিত করেছিল।

ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মেধাতালিকায় ১৬তম স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি সাহিত্য, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন।

স্নাতকোত্তর শেষ করার পর ড. ইউনূস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ব্যুরোতে নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের মতো প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের অধীনে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। একই সাথে তিনি একটি প্যাকেজিং ফ্যাক্টরি স্থাপন করে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ 'ফুলব্রাইট স্কলারশিপ' লাভ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি করার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। ১৯৭১ সালে তিনি সেখান থেকে সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।


কর্মজীবন ও প্রধান অর্জন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মজীবন বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যময়। একজন শিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজ সংস্কারক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন—তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই অর্জনে ভরপুর।


কর্মজীবনের শুরু

যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি সেখানে বসে থাকেননি; বরং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অন্যান্য বাঙালিদের সাথে মিলে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে তিনি 'বাংলাদেশ নিউজলেটার' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ড. ইউনূস স্বদেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসে তিনি সদ্য স্বাধীন দেশের পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দেন, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেখানে বেশিদিন কাজ করেননি। এরপর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন।


ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষ ড. ইউনূসের মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পড়ানো অর্থনীতির জটিল ও মার্জিত তত্ত্বগুলো বাস্তব জীবনে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় জোবরা গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন।

জোবরা গ্রামে তিনি সুফিয়া বেগম নামে এক নারী বাঁশশিল্পীর সাথে পরিচিত হন, যিনি মাত্র ২২ সেন্ট (তৎকালীন প্রায় ২১ টাকা) পুঁজির অভাবে মহাজনদের কাছে জিম্মি ছিলেন। মহাজনরা তাকে শর্ত সাপেক্ষে কাঁচামাল কেনার জন্য টাকা ধার দিত এবং উৎপাদিত পণ্য অতি নগণ্য মূল্যে তাদের কাছেই বিক্রি করতে বাধ্য করত। এই শোষণ ব্যবস্থা দেখে ড. ইউনূস হতবাক হয়ে যান। তিনি ব্যক্তিগতভাবে জোবরা গ্রামের ৪২ জন দরিদ্র মানুষকে মাত্র ২৭ মার্কিন ডলার (তৎকালীন ৮৫৬ টাকা) ধার দেন, যাতে তারা মহাজনদের ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।

এই ছোট একটি উদ্যোগই ছিল ক্ষুদ্রঋণ ধারণার বীজ। ড. ইউনূস বুঝতে পারেন যে, দরিদ্র মানুষের মূল সমস্যা দক্ষতা বা কর্মস্পৃহার অভাব নয়, বরং পুঁজির অভাব। তিনি প্রচলিত ব্যাংকগুলোর কাছে গিয়ে দরিদ্রদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেন, কিন্তু ব্যাংকগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, দরিদ্রদের ঋণ পরিশোধের কোনো জামানত নেই, তাই তারা 'ব্যাংকযোগ্য' নয়।

এর প্রতিবাদে ড. ইউনূস নিজেই গ্যারান্টার হয়ে ১৯৭৬ সালে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম শুরু করেন। তার এই মডেলটি অত্যন্ত সফল হয়। দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, অত্যন্ত সততার সাথে ঋণ পরিশোধ করতে শুরু করে। এই অসাধারণ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালে সরকারের একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে 'গ্রামীণ ব্যাংক' আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। এখানে ঋণের জন্য কোনো জামানতের প্রয়োজন হয় না। এর পরিবর্তে ঋণগ্রহীতারা ৫ জনের একটি দল গঠন করেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের ৯৭ শতাংশেরও বেশি গ্রহীতা হলেন নারী। ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন যে, নারীদের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিলে তা পুরো পরিবারের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে।


সামাজিক ব্যবসা

ক্ষুদ্রঋণের অভাবনীয় সাফল্যের পর ড. ইউনূস 'সামাজিক ব্যবসা' (Social Business) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন অর্থনৈতিক মডেল বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। সামাজিক ব্যবসা হলো এমন এক ধরনের কোম্পানি যা ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের জন্য নয়, বরং সমাজের কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের মূল বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত পান, কিন্তু কোনো অতিরিক্ত লভ্যাংশ নেন না। কোম্পানির যাবতীয় মুনাফা পুনরায় সমাজের উন্নয়নে বা ব্যবসার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করা হয়।

ড. ইউনূস ফ্রান্সের ড্যানোন কোম্পানির সাথে মিলে বাংলাদেশে 'গ্রামীণ ড্যানোন ফুডস' প্রতিষ্ঠা করেন, যার উদ্দেশ্য দরিদ্র শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করতে স্বল্পমূল্যে পুষ্টিকর দই সরবরাহ করা। এছাড়াও 'গ্রামীণ ভিওলিয়া ওয়াটার', 'গ্রামীণ কল্যাণ' সহ তিনি বহু সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তার এই ধারণা পুঁজিবাদের একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে।


অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা

ড. ইউনূসের জীবনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় ২০২৪ সালে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের ফলে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই সংকটময় মুহূর্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং দেশের আপামর জনসাধারণ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানান।

দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তিনি এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে সম্মত হন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার এই দায়িত্ব গ্রহণের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি দেশবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করে।


ব্যক্তিগত জীবন

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত জীবনও নানা ঘটনায় বৈচিত্র্যময়। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৭ সালে তার পরিচয় হয় রাশিয়ান-আমেরিকান ছাত্রী ভেরা ফরোস্তেনকোর সাথে। ১৯৭০ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর ভেরা ড. ইউনূসের সাথে বাংলাদেশে চলে আসেন। ১৯৭৯ সালে তাদের কন্যা মনিকা ইউনূসের জন্ম হয়। তবে বাংলাদেশের তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও কঠিন আর্থ-সামাজিক পরিবেশের সাথে ভেরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। ফলস্বরূপ, ১৯৭৯ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং ভেরা কন্যা মনিকাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। পরবর্তীতে মনিকা ইউনূস নিউইয়র্কে একজন বিখ্যাত অপেরা সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ড. ইউনূস আফরোজী ইউনূসকে বিবাহ করেন। আফরোজী ইউনূস পেশায় একজন পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এই দম্পতির ঘরে ১৯৮৬ সালে দিনা আফরোজ ইউনূস নামে এক কন্যার জন্ম হয়।

ব্যক্তিগতভাবে ড. ইউনূস অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, দারিদ্র্য মানবসমাজের কোনো স্বাভাবিক অংশ নয়। তার বিখ্যাত উক্তি হলো— "দারিদ্র্য সভ্য মানবসমাজে থাকতে পারে না, দারিদ্র্যের স্থান হওয়া উচিত জাদুঘরে।"


অবদান ও স্বীকৃতি

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল আজ শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও 'গ্রামীণ আমেরিকা' প্রজেক্টের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করা হচ্ছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণাকে পাল্টে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দরিদ্র মানুষেরা দাতব্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না, তারা শুধু একটি সুযোগ চায়।

বিশ্ব মানবতার কল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। নোবেল কমিটি তাদের ঘোষণায় উল্লেখ করে যে, নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ছাড়া স্থায়ী শান্তি অর্জন করা সম্ভব নয় এবং ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সেই কাজটিই করেছেন।

নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় সম্মাননা লাভ করেছেন। তিনি ইতিহাসের সেই হাতেগোনা কয়েকজন মহান ব্যক্তিদের একজন (যেমন- নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র), যারা একই সাথে নোবেল শান্তি পুরস্কার, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম (২০০৯) এবং কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল (২০১০) লাভ করেছেন।

এছাড়াও তিনি ১৯৮৪ সালে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ, প্রিন্স অফ আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড এবং সিউল পিস প্রাইজ সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পদকে ভূষিত হয়েছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ৫০টিরও বেশি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে। তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার জীবন ও কর্ম যুগ যুগ ধরে মানবতাকে পথ দেখাবে।


সচরাচর জিজ্ঞাস্য

Q: ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন? 

A: ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রউদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৬ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক দরিদ্র মানুষদের, বিশেষ করে নারীদের, বিনা জামানতে ঋণ প্রদান করে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে।

Q: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বর্তমান পেশাগত অবস্থান কী? 

A: তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বব্যাপী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

Q: গ্রামীণ ব্যাংক কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর মূল উদ্দেশ্য কী? 

A: ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের সফলতার ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বাধীন ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বিনা জামানতে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে দারিদ্র্য বিমোচন ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।

No comments:

Post a Comment

Bottom Ad [Post Page]

| Designed by Colorlib