বাপ্পারাজ বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক এবং প্রযোজক, যিনি মূলত তাঁর আবেগঘন ও ট্র্যাজেডি নির্ভর অভিনয়ের জন্য দর্শকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। ঢাকাই চলচ্চিত্রের 'ট্র্যাজেডি কিং' খ্যাত এই গুণী শিল্পীর অভিনয় ক্যারিয়ার, ব্যক্তিজীবন এবং পর্দার পেছনের গল্পগুলো নিয়ে সাজানো হয়েছে বাপ্পারাজ এর জীবনী, যা বাংলা সিনেমার অগণিত দর্শকদের জন্য এক নস্টালজিক যাত্রা।
photo by IMDB
এক নজরে
পূর্ণ নাম: রেজাউল করিম (জনপ্রিয় নাম: বাপ্পারাজ)
জন্ম তারিখ: ১১ মার্চ ১৯৬৩
জন্মস্থান: ঢাকা, বাংলাদেশ
মৃত্যু তারিখ: প্রযোজ্য নয়
জাতীয়তা: বাংলাদেশি
পেশা: চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ: 'প্রেমের সমাধি', 'বুক ভরা ভালোবাসা' ও 'পাগলী' সিনেমায় অনবদ্য অভিনয় এবং ত্রিভুজ প্রেমের চলচ্চিত্রে সফল উপস্থিতি।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
বাপ্পারাজ ১৯৬৩ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, কারণ তাঁর পিতা হলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা 'নায়করাজ' রাজ্জাক এবং মাতা খায়রুন্নেছা (লক্ষ্মী)। বাবার অভিনয় দেখে বড় হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিজেকে অভিনয়ের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বাবার দিকনির্দেশনা তাঁর প্রারম্ভিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
কর্মজীবন ও প্রধান অর্জন
কর্মজীবনের শুরু
বাপ্পারাজের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয় ১৯৮৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'চাপা ডাঙ্গার বউ' সিনেমার মাধ্যমে। কিংবদন্তি অভিনেতা ও পিতা রাজ্জাকের পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে তিনি শাবানা, আলমগীর এবং অরুণা বিশ্বাসের মতো জনপ্রিয় তারকাদের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করেন। প্রথম সিনেমাতেই তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয় এবং তিনি ঢাকাই সিনেমায় নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেন।
সাফল্য ও স্বীকৃতি
নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে বাপ্পারাজ ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম ব্যস্ত এবং জনপ্রিয় নায়ক। বিশেষ করে ত্রিভুজ প্রেমের গল্পে ব্যর্থ প্রেমিকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই জীবন্ত ছিল যে দর্শকরা তাঁকে 'ট্র্যাজেডি কিং' উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় সিনেমাগুলোর মধ্যে 'প্রেমের সমাধি', 'প্রেম গীত', 'তেজী', 'বুক ভরা ভালোবাসা', 'জবাবদিহি' এবং 'পাগলী' অন্যতম। অভিনয়ের পাশাপাশি ২০১৫ সালে 'কার্তুজ' নামক একটি অ্যাকশন রোমান্টিক সিনেমা নির্মাণের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি পারিবারিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান 'রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন'-এর সাথেও যুক্ত থেকেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন
পর্দায় ব্যর্থ প্রেমিকের চরিত্রে অভিনয় করলেও ব্যক্তিগত জীবনে বাপ্পারাজ একজন সফল সংসারী মানুষ। তিনি তানিয়া করিমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের সংসারে সন্তান রয়েছে। ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত সাদামাটা, বিনয়ী এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। পরিবারের প্রতি তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং পিতা রাজ্জাকের মৃত্যুর পর পারিবারিক ঐতিহ্যের হাল শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন। তাঁর ছোট ভাই খালিদ হোসেন সম্রাটও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ।
অবদান ও স্বীকৃতি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বাপ্পারাজ এমন একজন অভিনেতা, যিনি তাঁর বাবার বিশাল পরিচয়ের ছায়ায় না থেকে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে পেরেছিলেন। প্রেম, বিরহ এবং আত্মত্যাগের চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় বাংলা সিনেমায় একটি নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল। তিনি হয়তো জাতীয় পর্যায়ের অসংখ্য পুরস্কার পাননি, তবে সাধারণ দর্শকদের হৃদয়ে তিনি যে স্থায়ী আসন তৈরি করেছেন, তা যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির চেয়ে অনেক বড়। তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলো আজও বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের স্মৃতি বহন করে।
সচরাচর জিজ্ঞাস্য
বাপ্পারাজ এর আসল নাম কী?
বাপ্পারাজ এর আসল নাম রেজাউল করিম। তবে তিনি চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাপ্পারাজ নামেই সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয়।
বাপ্পারাজ এর বাবার নাম কী?
তাঁর বাবার নাম আব্দুর রাজ্জাক, যিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে 'নায়করাজ রাজ্জাক' হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ও কিংবদন্তি অভিনেতা। বাবার হাত ধরেই বাপ্পারাজের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে।
বাপ্পারাজ পরিচালিত প্রথম সিনেমা কোনটি?
বাপ্পারাজ পরিচালিত প্রথম ও একমাত্র সিনেমা হলো 'কার্তুজ'। এই সিনেমাটি ২০১৫ সালে মুক্তি পায় এবং দর্শকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলে।
No comments:
Post a Comment